আবারও ‘স্পট অব ডেথ’ সিলেটের সেই বন্দরবাজার

সময়ের ডাক : আবারও ‘স্পট অব ডেথ’ সিলেটের সেই বন্দরবাজার। যে অকুস্থলে ৪ মাসের ব্যবধানে মারধরের শিকার হয়ে নির্মমভাবে প্রাণ হারালেন দুই যুবক। একজন ইউনিফর্মধারীদের হাতে, অন্যজন অটোরিকশা চালকদের বেধড়ক মারপিটে।

গত বছরের ১১ অক্টোবর রাতে নগরীর কাষ্টঘর থেকেবন্দরবাজার ফাঁড়িতে সিলেট আখালিয়া এলাকার নেহারিপাড়ার যুবক রায়হান আহমদ (৩৫)-কে ধরে নিয়ে এসে নির্যাতন করে পুলিশ। ওইদিন সকালে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান তিনি। ১২ অক্টোবর রাত আড়াইটার দিকে রায়হানের স্ত্রী তাহমিনা আক্তার বাদি হয়ে সিলেট কোতোয়ালি থানায় নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে মামলা করেন।

মামলায় রায়হানের স্ত্রী তাহমিনা আক্তার উল্লেখ করেন, ১১ অক্টোবর ভোর ৪টা ৩৩ মিনিটে ০১৭৮৩-৫৬১১১১ মোবাইল ফোন নম্বর থেকে শ্বাশুড়ি (রায়হানের মা সালমা বেগম)-এর ব্যবহৃত মোবাইল ফোন নম্বর (০১৭৮৭৫৭০৯৪৯)-এ কল দিলে সেটি রিসিভ করেন রায়হানের চাচা হাবিবুল্লাহ।

এসময় রায়হান আর্তনাদ করে বলেন, তিনি বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে আছেন। তাকে বাঁচাতে দ্রুত ১০ হাজার টাকা নিয়ে বন্দর ফাঁড়িতে যেতে বলেন রায়হান। এ কথা শুনে রায়হানের চাচা ভোর সাড়ে ৫টা ও পরে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে গিয়ে রায়হানের সঙ্গে দেখা করতে পারেননি। পরে পুলিশের কথামতো হাববিুল্লাহ আবারও সকাল পৌনে ১০ টার দিকে ফাঁড়িতে গেলে দায়িত্বরত পুলিশ জানান, রায়হান অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাকে এম.এ.জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

সঙ্গে সঙ্গে রায়হানের চাচা ওসমানী হাসপাতালে গিয়ে জরুরি বিভাগে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, রায়হানকে সকাল ৬টা ৪০ মিনিটে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং সকাল ৭টা ৫০ মিনিটে তিনি মারা যান। এসময় হাবিবুল্লাহ পরিবারের অন্যান্য সদস্য ও আত্মীয়-স্বজনকে খবর দিলে তারা গিয়ে ওসমানীর মর্গে রায়হানের ক্ষত-বিক্ষত লাশ দেখতে পান।

১২ অক্টোবর বিকেল ৩টার দিকে পুলিশ রায়হানের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে। পরে বাদ এশা আখালিয়া জামে মসজিদের পার্শ্ববর্তী কবরস্থানে রায়হানের লাশ দাফন করা হয়।

নিহত রায়হানের মরদেহে ১১১টি আঘাতের চিহ্ন উঠে এসেছে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে। এসব আঘাতের ৯৭টি ফোলা আঘাত ও ১৪টি ছিল গুরুতর জখমের চিহ্ন। এসব আঘাত লাঠি দ্বারাই করা হয়েছে। অসংখ্য আঘাতের কারণে হাইপোভলিউমিক শক ও নিউরোজেনিক শকে মস্তিষ্ক, হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস, কিডনিসহ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো কর্মক্ষমতা হারানোর কারণে রায়হানের মৃত্যু হয়েছে।

রায়হান আহমদ হত্যা মামলার তদন্তে সর্বশেষ পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) আরও ৩০ কার্য দিবস সময় দিয়েছেন আদালত। রায়হান হত্যা মামলার তদন্তের জন্যে সময় বর্ধিত করার জন্যে গত ১০ ফেব্রুয়ারি সিলেটের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. আব্দুল মুমিনের আদালতে আবেদন করা হয়। ১৪ ফেব্রুয়ারি শুনানি শেষে আদালত ৩০ কার্য দিবস বর্ধিত করেন। এই সময়ের মধ্যেই রায়হান হত্যা মামলার অভিযোগপত্র দিতে হবে।

এদিকে, নির্মম ও চাঞ্চল্যকর সেই ঘটনার ৪ মাসের মাথায় সেই বন্দরবাজারে পিটুনিতে মারা গেলেন আরেক যুবক। তবে এবার ‘হত্যাকারী’ হলেন সিএনজি অটোরিকশা চালকরা।

শনিবার (২০ ফেব্রুয়ারি) রাত ৮টার দিকে বন্দরবাজারের কালেক্টরেট জামে মসজিদের সামনে সিএনজি অটোরিকশা চালকদের বেধড়ক মারপিটে নির্মমভাবে প্রাণ হারান মওদুদ আহমেদ (৩৫) নামের এক ব্যাংক কর্মকর্তা। এ ঘটনায় এখনও কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।

নিহত মওদুদ আহমেদ (৩৫) ময়মনসিংহ জেলার গৌরীপুর উপজেলার টেংগুরিপাড়া গ্রামের মো. আব্দুল ওয়াহেদের ছেলে। তিনি সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার অগ্রণী ব্যাংক, হরিপুর গ্যাস ফিল্ড শাখার অফিসার (ক্যাশ) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি নগরীর রাজারগলিতে একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন।

জানা গেছে, শনিবার বিকেলে জৈন্তাপুরের হরিপুর থেকে একটি সিএনজি অটোরিকশায় (নম্বর- সিলেট-থ-১২-৪২৭১) নগরীর বন্দরবাজারে আসেন ব্যাংক কর্মকর্তা মওদুদ আহমেদ। সন্ধ্যা ৭টা ৪৫ মিনিটে কালেক্টরেট জামে মসজিদের সামনে আসার পর সিএনজি অটোরিকশা চালক নোমান হাছনুর (২৮) সাথে ভাড়া নিয়ে বাকবিতন্ডা হয় মওদুদের। এক পর্যায়ে নোমানসহ আরো কয়েকজন সিএনজি অটোরিকশা চালক মওদুদ আহমেদকে বেধড়ক মারধর করেন। এ সময় মওদুদ গুরুতর আহত হয়ে পড়লে তাকে উদ্ধার করে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল হাসপাতালে নিয়ে যান মুরাদ আহমেদ ও ইউনুছ আলী নামে দুই ব্যক্তি। রাত ৮টা ৪২ মিনিটে হাসপাতালেই মারা যান মওদুদ আহমেদ।

পরদিন রোববার ময়না তদন্ত শেষে মওদুদের মরদেহ ময়মনসিংহস্থ তাঁর নিজ বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানেই লাশ দাফন করা হয়।

নিহত মওদুদের বড়ভাই আব্দুল ওয়াদুদ রোববার (২১ ফেব্রুয়ারি) বাদি হয়ে সিলেট সদর উপজেলার জালালাবাদ ইউনিয়নের টুকেরগাঁও পশ্চিমপাড়া গ্রামের আব্দুল হান্নানের ছেলে সিএনজি অটোরিকশা চালক নোমান হাছনুর নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত কয়েকজনকে আসামি করে সিলেট কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেছেন।

কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস এম আবু ফরহাদ সোমবার বিকেলে সিলেটভিউ-কে জানান, রোববার মওদুদের মরদে ময়মনসিংহে নিয়ে গিয়ে দাফন করা হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িতদের কাউকে এখনও গ্রেফতার করা যায়নি। তবে গ্রেফতারের জোর প্রচেষ্টা চলছে।