একামসেও রায়হানের শার্ট ও মোবাইল ফোন ফিরে পায়নি পরিবার

সময়ের ডাক :রায়হান আহমদ হত্যা মামলার সকল আলামত দ্রুত সংগ্রহ করার জন্য পিবিআইর প্রতি আহবান জানিয়েছেন নিহতের মা সালমা বেগম। শনিবার দুপুরে নিজ বাসায় সংবাদ সম্মেলন করে এমন আহ্বান জানান তিনি।

সিলেটের বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে ধরে আনার পর মারা যান নগরীর আখালিয়া এলাকার রায়হান আহমদ (৩৪)। পরিবারের পক্ষ থেকে প্রথম থেকেই অভিযোগ করা হচ্ছে, নির্যাতন চালিয়ে রায়হানকে হত্যা করা হয়েছে।

এই ঘটনার প্রধান অভিযুক্ত পুলিশের বহিস্কৃত উপ পরিদর্শক (এসআই) আকবর হোসেন ভূইয়াকে গত ৯ নভেম্বর সীমান্ত এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঘটনার পরপরই তিনি পালিয়ে ভারতে চলে যান বলে অভিযোগ রয়েছে। এরপর ১০ নভেম্বর তাকে ৭ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে মামলার তদন্তকারী সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

প্রধান অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারের পর শনিবার সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন ছেলে রায়হানের মৃত্যুর পর থেকেই বিচারের দাবিতে রাজপথে থাকা সালমা বেগম।

নিজ বাড়িতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, আটক হওয়ার পর আকবর জানিয়েছেন, উর্ধতন কর্মকর্তাদের বুদ্ধিতে তিনি পালিয়ে গিয়েছিলেন। আমরাও মনে করি রায়হান হত্যা এবং আকবরের পালিয়ে যাওয়ার সাখে আরও অনেক পুলিশ কর্মকর্তা জড়িত। রিমান্ডে আকবরকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে জড়িত অন্যদের চিহ্নিত করে তাদের গ্রেপ্তার করতে হবে।

রায়হান হত্যা আলামত সংগ্রহ করার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ১০ অক্টোবর রাতে রায়হানকে যখন পুলিশ ধরে নেয় তভন তার পড়নে ছিলো নীল শার্ট। অথচ পরদিন ১১ অক্টোবর সকালে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পড়ে থাকা রায়হানের মরদেহের পরণে ছিল লাল শার্ট। এছাড়া লাশ হস্তান্তরের সময় তার মোবাইল ফোনও ফিরিয়ে দেয়নি পুলিশ। রায়হান মারা যাওয়ায় একমাস পরও এর কোনটিই ফিরে পাইনি আমরা। সুষ্ঠ তদন্তের স্বার্থে তদন্তকারী সংস্থাকে এই আলামতগুলো উদ্ধার করতে হবে। নতুনা এই মামলার সুষ্ঠ তদন্ত সম্ভব হবে না।

রায়হান হত্যা মামলায় আকবর ছাড়াও আরও তিন পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তারের পর রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পিবিআই। ঘটনার দিন বন্দরবাজার ফাঁড়িতে কর্মরত থাকা এএসআই আশেক এলাহি, কনস্টেবল টিটু চন্দু দাস ও হারুনুর রশীদ রিমান্ড শেষে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিতে রাজী হননি।

 

তবে তারা জবানবন্দি না দিলেও এই মামলার সুষ্ঠ বিচারের ক্ষেত্রে তা কোনো প্রভাব ফেলবে না বলে জানিয়েছেন সিলেট জেলা জজ কোর্টের সাবেক পিপি ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ।

শনিবার রায়হানের মায়ের সংবাদ সম্মেলনে হাজির হয়ে তিনি বলেন, পুলিের তদন্ত কমিটি নির্যাতনের প্রমাণ পেয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ আছে। প্রত্যক্ষদর্শীরাও সাক্ষী দিয়েছেন। এখন আসামিরা জবানবন্দি না দিলেও তা বিচারে কোনো প্রভাব ফেলবে না। এছাড়া এই মামলার প্রধান অভিযুক্ত এসআই আকবর। ঘটনার সময় তিনি বন্দরবাজার ফাঁড়ির ইনচার্জ ছিলেন। তার নেতৃত্বেই নির্যাতন চালানো হয় বলে সবাই বলেছেন। আটকের পর জনতার কাছে আকবরেও স্বীকার করেছেন- ৫/৬জন মিলে মারধর করেছেন। ফলে তার জবানবন্দিটাই এই মামলায় গুরুত্বপূর্ণ।

রায়হান হত্যার বিচারের দাবিতে স্থানীয় এলাকাবাসী মিলে গড়ে তুলেছেন ‘বৃহত্তর আখালিয়া (১২ হামছায়া) সংগ্রাম পরিষদ’ নামে এইটি প্ল্যাটফর্ম। এই পরিষদের আহ্বায়ক ও স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর আজকের সংবাদ সম্মেলনে বলেন, রায়হান হত্যার তদন্তে কোন অবহেলা হলে বা কাউকে বাঁচানোর চেষ্টা করা হলে আরো কঠোর আন্দোলনের ডাক দেওয়া হবে।

প্রসঙ্গত, গত ১০ অক্টোবর রাতে বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে ধরে নেওয়া হয় রায়হান আহমদকে। পরদিন সকালে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তাকে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর পর পুলিশের পক্ষ থেকে প্রথমে দাবি করা হয়, ছিনতাইকালে গণপিটুনে মারা গেছেন রায়হান। তবে তার পরিবারের পক্ষ থেকে প্রথম থেকেই দাবি করা হচ্চে ফাঁড়িতে পুলিশের নির্যাতনে মারা গেছেন রায়হান। ১১ অক্টোবর রাতেই রায়হানের স্ত্রী বাদি হয়ে হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে থানায় মামলা দায়ের করেন।

এরপর মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হলে ওই কমিটি নির্যাতনের প্রাথমিক প্রমাণ পেয়েছে। ওই কমিটি দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পেয়ে ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভূইয়াসহ চার পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত ও তিন সদস্যকে প্রত্যাহার করে। ঘটনার পরপরই গা ঢাকা দেন এসআই আকবর।

নগরীর আখালিয়া এলাকার মৃত রফিকুল ইসলামের ছেলে রায়হান আহমদ (৩৪) নগরীর স্টেডিয়াম মার্কেট এলাকায় এক চিকিৎসকের সহকারি হিসেবে কাজ করতেন।