সিলেটে করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন সম্মুখযোদ্ধারা

সময়ের ডাক:প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে সিলেট বিভাগের প্রত্যেকটি জেলায়। এ ভাইরাসের বিরুদ্ধে যারা সামনে থেকে লড়বেন- সেই চিকিৎসক, নার্স আর স্বাস্থ্যকর্মীরাও আক্রান্ত হচ্ছেন। সিলেটজুড়ে তাদের আক্রান্তের সংখ্যাও বাড়ছে। করোনাযুদ্ধের ‘সম্মুখযোদ্ধা’রা আক্রান্ত হওয়ায় স্বাস্থ্যসেবায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন অনেকেই। তবে এ সম্মুখযোদ্ধাদের সুরক্ষায় পৃথক আবাসনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে সিলেট বিভাগের চারটি জেলায়। গতকাল পর্যন্ত সিলেট বিভাগে করোনাক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ২৪৩ জন। এর মধ্যে চারজন মারা গেছেন। মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে সিলেটের ওসমানী মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক ডা. মঈন উদ্দিনও রয়েছেন। দেশে করোনাক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া প্রথম চিকিৎসক তিনি। এদিকে, সিলেট বিভাগে করোনায় আক্রান্তদের মধ্যে চিকিৎসক, নার্সসহ অন্তত ৩৫ স্বাস্থ্যকর্মী রয়েছেন। স্বাস্থ্য অধিদফতর সিলেট বিভাগীয় কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সিলেট বিভাগের হবিগঞ্জ জেলায় স্বাস্থ্য খাতের সঙ্গে জড়িতরা সবচেয়ে বেশি করোনায় আক্রান্ত। এ জেলায় চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীসহ আক্রান্তের সংখ্যা অন্তত ২০। তার মধ্যে হবিগঞ্জ সদর আধুনিক হাসপাতালের এক চিকিৎসক, দুজন নার্স, প্যাথলজি বিভাগের দুজন, দুজন ব্রাদার, দুজন চালক, একজন ঝাড়ুদার ও একজন আয়া করোনায় আক্রান্ত। গত ২৬ এপ্রিল এ হাসপাতাল লকডাউন ঘোষণা করা হয়। হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক চিকিৎসক ও দুই নার্স, চুনারুঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক চিকিৎসক ও এক নার্স এবং মাধবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক ব্রাদার করোনা পজিটিভ হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন। লাখাই ও চুনারুঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বন্ধ ঘোষণা করে প্রশাসন। এ ছাড়া গত বৃহস্পতিবার হবিগঞ্জে আরেক চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী এবং গত শুক্রবার এক নার্স করোনা পজিটিভ হন। এদিকে, সিলেট জেলায় ওসমানী মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক ডা. মঈন উদ্দিন ছাড়াও এ হাসপাতালের এক ইন্টার্ন চিকিৎসক, শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালের এক স্টোরকিপার এবং জকিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক স্টোরকিপারও করোনায় আক্রান্ত। হাসপাতালের এক চিকিৎসকের গাড়িচালকেরও করোনা পজিটিভ ধরা পড়েছে। এ ছাড়া গত ২৭ এপ্রিল সিলেটের এক চিকিৎসক দম্পতি করোনায় আক্রান্ত হন বলে জানিয়েছেন সিলেটের সিভিল সার্জন ডা. প্রেমানন্দ ম ল। আক্রান্ত ওই দম্পতির স্বামী ঢাকায় স্বাস্থ্য বিভাগে কর্মরত। কয়েক দিন আগে তিনি সিলেটে আসেন। তার স্ত্রী সিলেটের একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজে কর্মরত। করোনায় সুনামগঞ্জের স্বাস্থ্যকর্মীরাও আক্রান্ত হচ্ছেন। গত ২৭ এপ্রিল সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্যানিটারি ইন্সপেক্টর, অ্যাম্বুলেন্সচালক ও এক স্বাস্থ্যকর্মী করোনা পজিটিভ হিসেবে শনাক্ত হন। পরে এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স লকডাউন ঘোষণা করা হয়। এ ছাড়া সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগের এক চিকিৎসকও আক্রান্ত হয়েছেন। স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে জড়িতরা একের পর এক আক্রান্ত হওয়ায় চিকিৎসক, নার্সসহ অন্যদের মধ্যে ভয় কাজ করছে। হাসপাতালে দায়িত্ব পালন শেষে তারা নিজ বাসায় ফিরতে চাইছেন না। কারণ, তাদের মাধ্যমে পরিবারের সদস্যরাও আক্রান্ত হতে পারেন। এ জন্য করোনাকালে তাদের জন্য পৃথক আবাসনের ব্যবস্থা করছে প্রশাসন। ইতিমধ্যে সিলেট জেলায় এসব সম্মুখযোদ্ধার জন্য নগরীর দরগাহ গেট এলাকায় একটি হোটেল চূড়ান্ত করা হয়েছে। গতকাল ওই হোটেলে চিকিৎসকরা ওঠা শুরু করেছেন। আর শহরতলির খাদিম এলাকায় নার্সদের জন্য একটি সরকারি রেস্ট হাউস বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদফতর সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক ডা. আনিসুর রহমান বলেন, ‘সব ধরনের স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে জড়িতদের জন্য আমরা পৃথক আবাসনের ব্যবস্থা করতে পারব না। তবে যারা কভিড-১৯ (করোনাভাইরাস) চিকিৎসার সঙ্গে জড়িত, তাদের জন্য পৃথক আবাসনের ব্যবস্থা করছি। বিভাগের চারটি জেলার সিভিল সার্জনদের এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। তারা সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের সঙ্গে আলোচনা করে হোটেল বা গেস্টহাউজের খোঁজ করছেন। করোনা চিকিৎসার সঙ্গে জড়িত সবাইকে হোটেলে রেখে খাবারের ব্যবস্থাও করা হবে। সিলেট জেলায় হোটেল ও রেস্ট হাউস চূড়ান্ত করা হয়েছে। সেখানে চিকিৎসক ও নার্সরা উঠতে শুরু করেছেন।’ তিনি জানান, কভিড-১৯ চিকিৎসার সঙ্গে জড়িতরা সাত থেকে ১০ দিন কাজ করে ১৪ দিন কোয়ারেন্টাইনে থাকবেন। তখন অন্য আরেকটি ব্যাচ চিকিৎসাসেবা প্রদান করবে।