বঙ্গবন্ধুর আদর্শে নিবেদিত প্রাণ ছিলেন দেওয়ান ফরিদ গাজী

এম আর টুনু তালুকদার : জননেতা দেওয়ান ফরিদ গাজীকে পাঠ করা এখন সময়ের দাবি। ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত আদর্শিক এ জাতীয় নেতার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও সার্বিক গ্রহণযোগ্য নেতৃত্বই প্রত্যেক রাজনৈতিক ব্যক্তির জন্য অনুসরণীয় ও অনুপ্রেরণার উৎস। আজীবন বঙ্গবন্ধুর আদর্শে নিবেদিত প্রাণ সৎ ও সাহসী রাজনীতিবিদ ফরিদ গাজী ছিলেন, আপোষহীন ও পরিচ্ছন্ন রাজনীতির প্রবাদপুরুষ। তিনি আজীবন বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ও অসম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার সংগ্রাম করেছেন। তাঁর রাজনীতির আদর্শ বাস্তবায়ন করা দরকার। প্রয়োজনে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ওয়ার্কশপ, সেমিনার আয়োজন করে তাঁর সেই অভিজ্ঞতা, ভাবনা, আদর্শ, অনুশীলন, সাফল্য, সব বিষয়ে জানা ও চর্চা করা, অনুসরণ প্রয়োজন।’ দেওয়ান ফরিদ গাজী শুধুমাত্র একজন রাজনীতিবিদই ছিলেন না। তিনি ছিলেন একটি প্রতিষ্ঠান, একটি আন্দোলন, একটি সুন্দর সমাজের প্রতিচ্ছবি। আমরা, তরুণ প্রজন্ম আজকের বাংলাদেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের প্রতিনিধিত্ব করে। তরুণ প্রজন্মর হাত ধরেই এগিয়ে যাবে আগামীর বাংলাদেশ।

আসলে কোনো প্রাগৈতিহাসিক সূচনা নয়।  জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর, বৃহত্তর সিলেট আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সংগঠক ও মহান মুক্তিযুদ্ধের উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় রণাঙ্গনের ৪ ও ৫ নং সেক্টরের বেসামরিক উপদেষ্টা ও প্রশাসনিক চেয়ারম্যান ৫ বার নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য সিলেটের মাটি ও মানুষের নেতা কিংবদন্তী জননেতা দেওয়ান ফরিদ গাজীকে পাঠ করা করা এখন সময়ের দাবী। বিশেষ করে ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে কুটিলতাহীন, সজ্জন, সহজ-সরল রাজনীতির আদর্শ ছিলেন তিনি। তার বর্ণাট্য রাজনৈতিক জীবনে অসম্মানজনক বা ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের দৃষ্টান্ত বিরল।  চরম সংকটেও তিনি ছিলেন দৃঢ়-স্থির, অবিচল, জীবন্ত। জনসম্পৃক্ততা ও জনকল্যাণই ছিল তাঁর শক্তি, উৎসাহ ও লক্ষ্য। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের ইতিহাসে তার তুলনা শুধু তিনিই। রাজনীতির যে কোনো তত্ত্ব-বিচারে দেওয়ান ফরিদ গাজী ভদ্র ও উদার রাজনীতির আদর্শ।  তার জন্মবার্ষিকীতে জানাই গভীর শ্রদ্ধা।

দেওয়ান ফরিদ গাজী জন্ম : ১৯২৪ সালের ১ মার্চ হবিগঞ্জ জেলায় নবীগঞ্জ থানার দেবপাড়া গ্রামে তাঁর জন্ম। তাঁর পিতা দেওয়ান মোহাম্মদ হামিদ গাজী ছিলেন দিনারপুর পরগণার জমিদার। ফরিদ গাজী হযরত শাহজালাল মুজাররদ-ই-ইয়েমেনীর (র) সফরসঙ্গী হযরত তাজউদ্দিন কোরেশীর (র) ১৬তম বংশধর।

দেওয়ান ফরিদ গাজীর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে। এরপর তিনি মৌলভীবাজার জুনিয়র মাদ্রাসা এবং সিলেট আলিয়া মাদ্রাসায় পড়াশুনা করেন। পরে মাদ্রাসা কারিকুলাম ত্যাগ করে সিলেট রসময় মেমোরিয়াল হাইস্কুলে ভর্তি হন। তিনি রসময় হাইস্কুল থেকে ১৯৪৫ সালে প্রবেশিকা, ১৯৪৭ সালে সিলেট মুরারিচাঁদ কলেজ থেকে আইএ এবং ১৯৪৯ সালে সিলেট মদন মোহন কলেজ থেকে বিএ পাস করেন।

হযরত শাহ জালাল (র.) এর সাথী ৩৬০ আউলিয়ার অন্যতম হযরত শাহ তাজ উদ্দিন কুরেশী তাদের পূর্ব পুরুষ। ১৯৫৩’ থেকে ১৯৫৫ পর্যন্ত সিলেটের প্রাচীনতম ‘সাপ্তাহিক যুগভেরী পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
‘১৯৪২সালে কুইট ইন্ডিয়া’ আন্দোলনের মাধ্যমে ছাত্র রাজনীতিতে যোগদান করেন। তিনি আসাম প্রাদেশিক মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনের সহ-সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৪৫ সালে আসামে বাঙ্গাল খেদাও আন্দোলন, ১৯৪৬ সালে গণভোট, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধসহ সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান দিয়ে রাজনীতি শুরু করা এই রাজনৈতিক ১৯৭০ সালে সাধারণ নির্বাচনে সিলেট- ১ আসন থেকে জাতীয় পরিষদ সদস্য (এমএনএ) নির্বাচিত হন। বঙ্গবন্ধু সরকারের স্থানীয় সরকার ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী এবং পরে বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৬, ২০০১ এবং ২০০৮ সালে হবিগঞ্জ-১ (নবীগঞ্জ-বাহুবল) আসন থেকে সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হন এবং বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

ফরিদ গাজী ছিলেন সংস্কৃতিমনা এবং শিক্ষার উদার পৃষ্ঠপোষক। সিলেট অঞ্চলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে তাঁর অসামান্য অবদান রয়েছে। তিনি সুদীর্ঘকাল সিলেটের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠন কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের সভাপতি ছিলেন। উদার হৃদয়ে মানুষ ফরিদ গাজী অত্যন্ত সাদাসিদা জীবনযাপন করতেন। নিরহঙ্কার ও সজ্জন এই মানুষটি দলমত নির্বিশেষে ছিলেন সকল শ্রেণির লোকের শ্রদ্ধাভাজন। দেওয়ান ফরিদ গাজী ২০১০ সালের ১৯ নভেম্বর ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে সিলেটে হজরত শাহজালালের (রহ.) মাযার সংলগ্ন কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। সর্বোপরি, ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত আদর্শিক এ জাতীয় নেতার শিক্ষাগত যোগ্যতা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও সার্বিক গ্রহণযোগ্য নেতৃত্বই প্রত্যেক রাজনৈতিক ব্যক্তির জন্য অনুসরণীয় ও অনুপ্রেরণার উৎস। আজীবন বঙ্গবন্ধুর আদর্শে নিবেদিত প্রাণ সৎ ও সাহসী রাজনীতিবিদ ফরিদ গাজী ছিলেন, আপোষহীন ও পরিচ্ছন্ন রাজনীতির প্রবাদপুরুষ। তিনি আজীবন বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ও অসম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার সংগ্রাম করেছেন। তার হাত ধরে যারা আজকে রাজনীতি করছেন তার রাজনীতির আদর্শ বাস্তবায়ন করা দরকার। প্রয়োজনে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ওয়ার্কশপ, সেমিনার আয়োজন করে তাঁর সেই অভিজ্ঞতা, ভাবনা, আদর্শ, অনুশীলন, সাফল্য, সব বিষয়ে জানা ও চর্চা করা, অনুসরণ বেশ প্রয়োজন।’ দেওয়ান ফরিদ গাজী শুধুমাত্র একজন রাজনীতিবিদই ছিলেন না। তিনি ছিলেন একটি প্রতিষ্ঠান, একটি আন্দোলন, একটি সুন্দর সমাজের প্রতিচ্ছবি, একটি সংগীত, একটি জাতির অহংকার। আমরা, তরুণ প্রজন্ম আজকের বাংলাদেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের প্রতিনিধিত্ব করি। তরুণ প্রজন্মর হাত ধরেই এগিয়ে যাবে আগামীর বাংলাদেশ” সিলেটের মাটি ও মানুষের নেতা কিংবদন্তী জননেতা দেওয়ান ফরিদ গাজীকে পাঠ করা করা এখন সময়ের দাবী।

লেখক : সাংবাদিক।