এনআরবি ব্যাংকে কর্তৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব

সময়ের ডাক ডেস্ক:কর্তৃত্ব পেতে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছে এনআরবি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ। কয়েকজন উদ্যোক্তা ও পরিচালক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মাহতাবুর রহমানের পক্ষে থাকলেও বড় অংশই তার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এ নিয়ে ব্যাংকটির প্রায় সব পর্ষদ সভায় বাগিবতণ্ডা হচ্ছে। সর্বশেষ গত রোববারের পর্ষদ সভায়ও এর পুনরাবৃত্তি হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পর্ষদের সভা স্থগিত হলে ২৯ ডিসেম্বর আবারো সভাটি অনুষ্ঠিত হবে বলে জানা গেছে।

পরিচালনা পর্ষদে বড় ধরনের বিভক্তির কালো ছায়া পড়েছে এনআরবি ব্যাংক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনায়ও। এরই মধ্যে ব্যাংকটির রিটেইল বিভাগের প্রধান বাহাত শামসসহ বিভিন্ন পদমর্যাদার বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা চাকরি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের প্রভাবে এনআরবি ব্যাংকের প্রবৃদ্ধিও স্তিমিত হয়ে গেছে। গত এক বছরে ব্যাংকটির অবয়ব ১০ শতাংশও বাড়েনি। ২০১৮ সালের ডিসেম্বর শেষে এনআরবি ব্যাংকের বিতরণকৃত ঋণ ছিল ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে তা ৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকায় আটকে আছে, ২০১২ সালে লাইসেন্স পাওয়া নয়টি ব্যাংকের মধ্যে যা সর্বনিম্ন। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে এনআরবি ব্যাংকের নিট লোকসান ৪০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে বলেও সংশ্লিষ্টরা নিশ্চিত করেছেন।

এনআরবি ব্যাংকের পরিচালকদের বড় অংশের অভিযোগ হলো, মাহতাবুর রহমান এনআরবি ব্যাংক লিমিটেডকে পারিবারিক ব্যাংকে রূপান্তর করতে চাইছেন। এজন্য তিনি নামে-বেনামে শেয়ার কিনছেন। এরই মধ্যে ছেলে মোহাম্মদ এহসানুর রহমান এবং ভাতিজা মোহাম্মদ আশফাকুর রহমান ও এমদাদুর রহমানের নামে শেয়ার কিনেছেন। এক্ষেত্রে ব্যাংকটির মেমোরেন্ডাম অব আর্টিকেল ও আর্টিকেল অব অ্যাসোসিয়েশনের শর্ত ভঙ্গ করেছেন তিনি।

ব্যাংকটির বিদ্যমান পরিস্থিতিকে মোটেই সুখকর নয় বলে দাবি করেন প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ইকবাল আহমেদ ওবিই। তিনি বলেন, কিছু সজ্জন ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়ে এনআরবি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেছিলাম। কিন্তু বর্তমানে ব্যাংকটিতে একনায়কতন্ত্র চলছে। কেউ কথা বললেই তাকে হয়রানি করা হচ্ছে। পরিচালনা পর্ষদ থেকে বের করে দেয়ার হুমকি দেয়া হচ্ছে। আমাদের উত্তরাধিকারীদের বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতেই ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেছিলাম। কিন্তু উদ্দেশ্যের সঙ্গে বাস্তবতাকে মেলাতে পারছি না। গত তিন বছরে এনআরবি ব্যাংক সবক’টি সূচকে দুর্বল হয়েছে। এ নিয়ে রোববারের বৈঠকেও বাগিবতণ্ডা হয়েছে। পরিস্থিতি যা, তাতে প্রয়োজনে শেয়ার ছেড়ে দিয়ে চলে যাব, কিন্তু ঝগড়া করতে পারব না।

প্রায় একই অভিযোগ এনআরবি ব্যাংকের আরেক পরিচালক এম বদিউজ্জামানের। বর্তমানে ব্যাংকটির নির্বাহী কমিটির (ইসি) চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব পালন করছেন সিঙ্গাপুর প্রবাসী এ উদ্যোক্তা। তিনি বলেন, আতর বিক্রি আর ব্যাংক পরিচালনা এক নয়। মাহতাবুর রহমান আতর বিক্রেতা হিসেবে সফল হতে পারেন, কিন্তু ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে ব্যর্থ। চেয়ারম্যান পরিচালনা পর্ষদের সব ক্ষমতা নিজের হাতে কুক্ষিগত করেছেন। মাহতাবুর রহমানের ভুলের প্রতিবাদ করলেই তাকে কিক মারা হচ্ছে। ব্যাংকের ইসি কমিটির চেয়ারম্যান হলেও আমার কোনো ক্ষমতা নেই। অনেক স্বপ্ন নিয়েই এনআরবি ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলাম। এত সহজে এ স্বপ্নের মৃত্যু হতে দেয়া যায় না। এ বিষয়ে আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করব।

চেয়ারম্যান হিসেবে মাহতাবুর রহমানের অনিয়ম ও নীতিভঙ্গের এক ডজনের বেশি অভিযোগ তুলেছেন এনআরবি ব্যাংকের উদ্যোক্তারা। অভিযোগে বলা হয়, ঋণখেলাপি হয়েও মাহতাবুর রহমান এনআরবি ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদ আঁকড়ে রেখেছেন। ২০১৬ সালের ৩০ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংক ইউনাইটেড এয়ারলাইনসের ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতার কারণে মাহতাবুর রহমানের পরিচালক পদ শূন্য করেছিল। স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেই এ নির্দেশ দিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কিন্তু বিষয়টিকে গোপন রেখে তিনি উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব পালন করছেন।

চেয়ারম্যান পদ স্থায়ীভাবে ধরে রাখার জন্য মাহতাবুর রহমান এনআরবি ব্যাংকের ছোট উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে শেয়ার কিনে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ তুলেছে পরিচালকদের একাংশ। তাদের বক্তব্য হলো, ছোট অংশীদারদের শেয়ার কিনে নেয়ার জন্য মাহতাবুর রহমান পরিকল্পিতভাবে এনআরবি ব্যাংকের পরিস্থিতি খারাপ করে তুলছেন। এর মাধ্যমে তিনি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত উদ্যোক্তাদের শেয়ার নিজ পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনের নামে কিনে নিচ্ছেন। পরিচালনা পর্ষদকে তোয়াক্কা না করে এরই মধ্যে তিনি ছেলে মোহাম্মদ এহসানুর রহমান, ভাতিজা মোহাম্মদ আশফাকুর রহমান ও এমদাদুর রহমানের নামে শেয়ার কিনেছেন। বর্তমানে এ তিনজনের শেয়ারের পরিমাণ ১৪ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। এর মধ্য দিয়ে তিনি এনআরবি ব্যাংককে পারিবারিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পরিণত করছেন। ঠিক এভাবেই তিনি ইউনাইটেড এয়ারলাইনস কিনে নিয়েছিলেন। এয়ারলাইনসটির প্রতিষ্ঠাতা ক্যাপ্টেন তাসবিরুল আহম্মেদ চৌধুরীকে সরিয়ে মাহতাবুর রহমান দায়িত্ব নিয়েছিলেন। কিন্তু সফল সে এয়ারলাইনসটিকে তিনি ডুবিয়েছেন।

এনআরবি ব্যাংকের একাধিক পরিচালক বলেন, ২০১৬ সালে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণের সময় মাহতাবুর রহমান বলেছিলেন, তার মেয়াদে এনআরবি ব্যাংক আগের বছরের চেয়ে বেশি (১২ শতাংশ) ডিভিডেন্ড দেবেন। এর চেয়ে কম হলে তিনি ব্যক্তিগতভাবে ১৫০ কোটি টাকা জমা দেবেন। কিন্তু ২০১৮ সালে এনআরবি ব্যাংক মাত্র ৮ শতাংশ স্টক ডিভিডেন্ড দিতে পেরেছে। চলতি বছরে ব্যাংকটি ৪০ কোটি টাকা নিট লোকসান দিয়েছে।

এতে বলা হয়, প্রবাসী বাংলাদেশীদের পরবর্তী প্রজন্মকে বাংলাদেশমুখী করতেই এনআরবি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। কিন্তু মাহতাবুর রহমান চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রাহণের পর সে পথ রুদ্ধ করে দিয়েছেন। মিথ্যা আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে লন্ডন প্রবাসী উদ্যোক্তা খলিলুর রহমানকে পর্ষদ থেকে পদত্যাগ করিয়েছেন। কিন্তু তার ছেলেকে এখন পর্যন্ত পরিচালক করা হয়নি। মালয়েশিয়া প্রবাসী উদ্যোক্তা-পরিচালক প্রকৌশলী মো. একরামুল হকের শেয়ার চেয়ারম্যানের ভাতিজা আশফাকুর রহমানের নামে কিনে নিয়েছেন। সিঙ্গাপুর প্রবাসী উদ্যোক্তা-পরিচালক প্রকৌশলী আমানউল্লাহ এককভাবে সবচেয়ে বেশি ৮ দশমিক ১৪ শতাংশ শেয়ারের মালিক। কিন্তু তাকে পরিচালনা পর্ষদে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না।

মাহতাবুর রহমান দুবাইয়ে আল হারামাইন নামে একটি কোম্পানির মালিক। সিলেট আল হারামাইন নামে একটি হাসপাতালও রয়েছে তার।

তবে চেয়ারম্যান হিসেবে তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মাহতাবুর রহমান। তিনি বলেন, কিছু পরিচালক ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে টাকা লোপাট করতে চেয়েছেন। কিন্তু আমি চেয়ারম্যান থাকা অবস্থায় সেটি সম্ভব নয় বলেই তারা আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছেন। ব্যাংকের টাকা জনগণের আমানত। এ টাকা নিয়ে কাউকে ছিনিমিনি খেলতে দেব না। আমি বলেছি, যে কেউ অভিযোগ তুললে তার প্রমাণ দিতে হবে। অন্যথায় তাদের বিরুদ্ধে মামলা করব।

মাহতাবুর রহমান বলেন, ইউনাইটেড এয়ারলাইনস যখন স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া থেকে ঋণ নিয়েছে, তখন আমি সেটির সঙ্গে ছিলাম না। পরবর্তী সময়ে আমি এয়ারলাইনসটির দায়িত্ব নিয়ে দেখি, সেটি আগেই লোপাট হয়ে গেছে। এজন্য আমি এয়ারলাইনসটি ছেড়ে দিই। স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া আদালতে কোনো প্রমাণ দিতে পারেনি। এজন্য মামলাটির ওপর উচ্চ আদালত স্থগিতাদেশ দিয়েছেন। আমি মাহতাবুর রহমান এনআরবি ব্যাংক দিয়ে পরিচিত হতে চাই না। সারা বিশ্বের মানুষ আমাকে আল হারামাইন ব্র্যান্ডের নামে চেনে। চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রাহণের পর থেকে এখন পর্যন্ত কোনো পর্ষদ সভার জন্য ১ টাকার সম্মানীও আমি নিইনি। অন্য পরিচালকরা প্রতিটি সভার জন্য ৫ হাজার ডলার করে সম্মানী নিয়েছেন। ব্যাংকের টাকায় আমি এক কাপ চা পর্যন্ত খাই না।

এনআরবি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছিলেন যুক্তরাজ্য প্রবাসী ব্যবসায়ী ইকবাল আহমেদ (ওবিই)। ৪০০ কোটি টাকার মূলধন জোগাতে আহ্বান জানিয়েছিলেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীদের। এ উদ্যোগে শামিল হয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ইতালি, সিঙ্গাপুর, জাপান, আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী ৪৬ জন প্রবাসী।

২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল ইকবাল আহমেদের নামে ব্যাংক স্থাপনের জন্য লেটার অব ইনটেন্ট দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। তার ভিত্তিতেই যাত্রা করে এনআরবি ব্যাংক লিমিটেড। ব্যাংকটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান নির্বাচিত ইকবাল আহমেদ। দুই বছর পর ২০১৬ সালে এনআরবি ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন আলোচিত প্রবাসী ব্যবসায়ী মোহাম্মদ মাহতাবুর রহমান (নাসির)। কিন্তু যাত্রার সাত বছরের মধ্যেই পথ হারিয়েছে চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংকটি।

সম্প্রতি এনআরবি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ শাখাগুলোতে পরিদর্শন চালায় বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনেও এনআরবি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ, সঞ্চিতি সংরক্ষণ, কর্মী নিয়োগসহ বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম ধরা পড়েছে। একইভাবে ব্যাংকটির গ্রাহক গোল্ডেন ইনফিনিটি লিমিটেড, মেসার্স এইচ আকবর আলী অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড, মেসার্স মাসুদ অ্যান্ড ব্রাদার্স লিমিটেড, মেসার্স সিরাজ আনু ইস্পাত লিমিটেডসহ কয়েকটি বড় ঋণের বিষয়ে অনিয়ম খুঁজে পেয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
সূত্র: বণিক বার্তা