প্রচ্ছদ > অপরাধ > নিয়োগ বাণিজ্য, নয় জনের ৩ জনই ‘সাদেকের স্বজন’

নিয়োগ বাণিজ্য, নয় জনের ৩ জনই ‘সাদেকের স্বজন’

অপরাধ সিলেট প্রতিক্ষণ সিলেট শীর্ষ

সময়ের ডাক :২০১৮ সালের নভেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে অনুষ্ঠিত হয় সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৩য় শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগ পরীক্ষা। নয় পদের এই নিয়োগ পরীক্ষায় বাংলাদেশ নার্সেস এসোসিয়েশন (বিএনএ) সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল শাখার সাধারণ সম্পাদক ইসরাইল আলী সাদেকেরই ‘তিন স্বজনের’ চাকরি হয়।

এরমধ্যে সাদেকের ভাতিজি, ঘনিষ্ঠ বন্ধুর স্ত্রী ও ‘টাকার বিনিময়ে’ আরেকজনকে আত্মীয় করে নিয়েছেন। তবে তিনি যে শুধুই আত্মীয় কিংবা স্বজন হিসেবে নিয়োগ করিয়েছেন এমনটা নয়, এদের কাছ থেকেও নিয়েছেন বিশাল অংকের টাকা।

জানা যায়, ওসমানী হাসপাতালের ৩য় শ্রেণি সমমান মোট ৯ টি পদে ৯ জন লোকবল সংকট দেখা দিলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী নভেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে ওসমানী মেডিকেল কলেজেই অনুষ্ঠিত হয় লিখিত পরীক্ষা। পরীক্ষা হলের দায়িত্বে ছিলেন হাসপাতালের কর্মকর্তারা। এক দিনের এ পরীক্ষায় সকালে অনুষ্ঠিত হয় লিখিত পরীক্ষা, বিকেলে ফলাফল আর রাতেই হয় ভাইবা। আর এই একদিনেই নাকি সাদেকের কপাল খোলে। এ পরীক্ষার মধ্যদিয়েই নিয়োগ হয় সাদেকের ‘৩ স্বজনের।’

 

নিয়োগপ্রাপ্ত ৩ জনের একজন হলেন পরিসংখ্যানবিদ পদে সামসিয়া বেগম, স্টোর কিপার আয়শা বেগম, টেলিফোন অপারেটর আতাউর রহমান। এর মধ্যে সামসিয়াকে সকলে সাদেকের ভাতিজি হিসেবেই চিনেন। অপরজন হলেন সাদেকের ঘনিষ্ঠ বন্ধুর স্ত্রী। তিনি প্যাথিড্রিনসহ র‍্যাবের হাতে সাদেকের সাথে গ্রেপ্তার হওয়া বালুচর এলাকার ওমর ফারুকের স্ত্রী আয়শা বেগম। এছাড়াও ড্রাইভার পদে সাদেকের আরও এক ঘনিষ্ঠজন দুদক সিলেট কার্যালয়ের এক গাড়ি চালকের ভাই আতাউর রহমান।

নিয়োগ পরীক্ষায় বাণিজ্য ? সত্য না মিথ্যা সেটাও যাচাইয়ের বিষয়।  তবে অনুসন্ধানের শুরুতেই হতাশ হতে হয় প্রতিবেদককে। কারণ সাদেকের ভয়ে হাসপাতালের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারি কোন কথাই বলতে চাননি। কিন্তু এ প্রতিবেদকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিলেন হাসপাতালেরই এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।

 

নিজের নাম পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, আমরা দেখি আপনারা সাংবাদিকরা সত্যের পক্ষে কথা বলেন, অন্যায় বিষয়গুলো সমাজের সকলের কাছে লিখনির মাধ্যমে তুলে ধরেন। আর এজন্যই অপরাধীরা অপরাধ করতে ভয় পায়। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্র বিশেষে আমরা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হলেও সংগত কারণেই আটকে যাই। তবু বলি আপনি যেটা বলছেন আমারও সেটা নিয়ে প্রশ্ন। নিয়োগ হয়েছে ৯ জনের। এর মধ্যে সাদেক সাহেবেরই স্বজন ৩ জন। ব্যাপারটা হলো আজকাল উপকৌটন শব্দটা বেশ প্রচলিত। ব্যাপারটা নিয়ে আপনারা একটু ঘাটাঘাটি করলে সম্ভবত অনেক তথ্যই পাবেন।

ঊর্ধ্বতন এ কর্মকর্তার কথায় তখনও ঘোর কাটেনি। কারণ বিষয়টি নিয়ে আরও বিস্তারিত অনুসন্ধান প্রয়োজন। তাই প্রতিবেদক যোগাযোগ করে হাসপাতালের সাবেক এক ঊর্ধ্বতন এ কর্মকর্তার সঙ্গে। তিনি নাম পরিচয় গোপন রাখার স্বার্থে আমাদের সাথে প্রায় দুই ঘণ্টা কথা বলেন। বলেন নিয়োগ ব্যবস্থা, প্রক্রিয়া মাধ্যম নিয়েও। কেবল তাই না, সাবেক এ কর্মকর্তা হাসপাতালের আরো বেশ কিছু কথা জানানোর পাশাপাশি একাধিক প্রমাণও দিলেন।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, নির্বাচন প্রাক্কালে স্থানীয় নেতারা যখন নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত এ সুযোগে সাদেক ভাতিজি ও বন্ধুর স্ত্রীকে চাকরি দিলেও তাদের কাছ থেকে প্রায় ২০ লক্ষাধিক টাকা হাতিয়ে নেন। তবে ড্রাইভার পদে দুদক সিলেট কার্যালয়ের এক ড্রাইভার আছেন যিনি সাদেকের সকল বিপদের কাণ্ডারি। কেবল তার ভাই আতাউর রহমানের ভাইয়ের চাকরির জন্য সাদেক কোন টাকা আদায় নেন নি।

সব শেষে আক্ষেপ প্রকাশ করে এ কর্মকর্তা বলেন, কত কিছুই নিজ চোখে দেখেছি কিন্তু অসহায় হয়ে কেবল দেখা ছাড়া আর কিছুই করার ছিলো না। এ কর্মকর্তার সাথে কথোপকথনের রেকর্ড প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত আছে।

অপরদিকে পরিচয় গোপন রেখে সাদেকেরই সুহৃদ হয়ে কথা হয় তার এক ঘনিষ্ঠজনের সাথে। চলে প্রায় ঘণ্টা খানেক আলোচনা। আক্ষেপ প্রকাশ করে তিনি দুষলেন শত্রু পক্ষকে।

তিনি বলেন, সবই একটা চক্রান্ত। সাদেকের ক্ষমতা আর টাকা দেখে অন্যদের সহ্য হচ্ছে না। সায় দেন এ প্রতিবেদক। তখন তিনি আরো বলেন, মানলাম তার মানুষকে চাকরি দিয়েছে, পাতের, এম্বুলেন্সের ব্যবসা করছে তাতে অন্যের সমস্যা কি? আরে বাবা চাকরি হয়তো তার মানুষকে দিয়েছে কিন্তু টাকা কি একা নিয়েছে? সব দুষ কেবল সাদেকের। মূলত সব কিছুতো ভাই একাই নিয়ন্ত্রণ করছে এজন্য অন্যদের সহ্য হচ্ছে না।

 

অবশ্য সামগ্রিক বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করলেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, এসব ক্ষেত্রে দুদকের তদন্ত করা উচিৎ। তাছাড়া আগামীতে নিয়োগের ব্যাপারে সাদেকের মত মানুষের কথা বিবেচনায় সকল ক্ষেত্রে ভিন্ন বিভাগের মানুষের সমন্বয়ে আলাদা নিয়োগ কমিটি থাকা উচিৎ। যদিও বলা হবে সাদেকের স্বজনরা যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ পেয়েছেন কিন্তু এটা আমরা সকলেই বুঝতে পারছি তারা কি ভাবে নিয়োগ পেয়েছে। তাই এখন দুদকের তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে।

তবে সব ব্যাপারে অভিযুক্ত বাংলাদেশ নার্সেস এসোসিয়েশন (বিএনএ) সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল শাখার সাধারণ সম্পাদক ইসরাইল আলী সাদেকের বক্তব্য গ্রহণ করতে দুই দিন থেকে তার ব্যবহৃত, ০১৭১৫….৭৬, ০১৭১২….৯৫, ০১৭৫৫….২০ নাম্বারে একাধিকবার চেষ্টা করে তা বন্ধ পাওয়া যায়। এরপর তাকে ক্ষুদে বার্তা পাঠালে তিনি কোন উত্তর দেননি।

এদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুদকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, পূর্বে হাসপাতালের যন্ত্রাংশ কেনার ক্ষেত্রে অনিয়মের ব্যাপারে দুদক তদন্ত করছে। ইতিমধ্যে কোর্টে চার্জশিটও পাঠানো হয়েছে। তাছাড়া বর্তমান সময়ে সাদেকের বিরুদ্ধে যেসব অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ উঠছে এগুলো তদন্ত করা হবে।

অপরদিকে নিয়োগ পরীক্ষা তিনি আসার আগে হয়েছে জানিয়ে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইউনুসুর রহমান  জানান, নিয়োগটা আমার আসার আগে হয়েছে। তাই আমি খোঁজ খবর নিয়ে দেখতে হবে কারা কারা নিয়োগ পেয়েছে। কারণ সব কিছু আমার জানা নেই। না জেনে আমি আপাতত কোন মন্তব্য করতে পারছি না।

এদিকে মাদক মামলায় আসামি হওয়ার ঘটনায় বিভাগীয় ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন জানিয়ে তিনি বলেন, যেহেতু নিয়মতান্ত্রিক একটি ব্যবস্থা নিতে হয় তাই আমরা সে লক্ষেই কাজ করছি।সূত্র সিলেট ভয়েজ