প্রচ্ছদ > সিলেট প্রতিক্ষণ > ইয়াবা পাচারের নিরাপদ রুট জকিগঞ্জ॥ নারীরাও জড়াচ্ছেন

ইয়াবা পাচারের নিরাপদ রুট জকিগঞ্জ॥ নারীরাও জড়াচ্ছেন

সিলেট প্রতিক্ষণ

নিজস্ব প্রতিবেদক:সিলেটে হাত বাড়ালেই পাওয়া যাচ্ছে মরণ নেশা ইয়াবা। এ নেশাটি আধুনিক নেশা হিসাবে তরুণ-তরুণীদের কাছে পরিচিত। কেউ শখের বশে আসক্ত হয়ে অন্ধকার জগতে পা দিচ্ছে। স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবীদের একটি বড় অংশও ইয়াবায় আসক্ত হচ্ছে।

নীরব ঘাতক ইয়াবার সর্বনাশা থাবায় শত শত পরিবার বিপন্ন হচ্ছে। আর ইয়াবা বেচাকেনার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন দাপুটে লোক, র‌্যাব-পুলিশের সোর্স, জনপ্রতিনিধিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সদস্য। এদিকে, প্রতিদিন মাদক কারবারীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের হাতে আটক হলেও এ সিন্ডিকেটের সদস্যদের কোনভাবেই দমানো যাচ্ছে না। দিন দিন বেড়েই চলছে ইয়াবার বিস্তার।
সূত্র জানায়, ইয়াবা পাচারের নতুন রুট হিসেবে মাদক কারবারীরা বেছে নিয়েছে সিলেটের জকিগঞ্জ সীমান্তকে। এ সীমান্ত দিয়েই এখন সবেচেয়ে বেশি ইয়াবা বাংলাদেশে আসছে।

২০১৭ সাল থেকেই এ সীমান্ত দিয়ে ইয়াবার বড় বড় চালান আসা শুরু হয়। সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর কড়া নজরদারির পরও এই সীমান্ত দিয়ে বাড়ছে ইয়াবা পাচারকারীদের আনাগোনা। আর এ ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছেন স্থানীয় কিছু রাজনীতিবিদ ও জনপ্রতিনিধি। গত মাসে ইয়াবার চালান নিয়ে ঢাকায় যাওয়ার পথে সিলেট রেলওয়ে স্টেশন এলাকা থেকে তাদেরই দুই সদস্যকে আটক করে র‌্যাব-৯। তবে এ বছরের চলতি মাস পর্যন্ত তেমন বড় কোনো চালান ধরা পড়েনি এই সীমান্তে। র‌্যাব-৯ এর একটি সূত্র জানিয়েছে, তাদের কাছে দু’ধরনের তথ্য রয়েছে। একটি হলো, ইয়াবা ট্যাবলেট প্রস্তুতকারী দেশ মিয়ানমার হতে ভারতের মনিপুর-ইম্ফল-শিলচর হয়ে ঢুকছে সীমান্তবর্তী ভারতের করিমগঞ্জে। সেখান থেকেই রাতের আঁধারে নদী পার হয়ে বাংলাদেশে ঢুকছে ইয়াবার চালান। দ্বিতীয়ত, ভারতের এই সীমান্ত এলাকায় ছোট ছোট ইয়াবার কারখানা রয়েছে।

এদিকে ইয়াবা সেবন, বিক্রি ও মাদক বহনে জড়িয়ে পড়ছে কিছু নারী। অল্প কিছু টাকার বিনিময়ে ভয়ঙ্কর এই পেশায় জড়াচ্ছে তারা। গত কয়েকদিন আগে রাতে সিলেট রেলওয়ে স্টেশনের টিকিট কাউন্টারের সামনে থেকে ৩৮০৫ পিস ইয়াবাসহ তামান্না ও শহিনুর নামের মাদক পাচারকারী দুই নারীকে আটক করে র‌্যাব-৯। দুজন সম্পর্কে খালা-বোনঝি। আটকের পর জিজ্ঞাসাবাদে বেশ চাঞ্চল্যকর তথ্য পায় র‌্যাব। র‌্যাব জানায়, মাত্র ৫ হাজার টাকার বিনিময়ে জকিগঞ্জ থেকে ৩ হাজার ৮০৫ পিস ইয়াবার চালান নিয়ে তারা সিলেট হয়ে ঢাকায় নিয়ে যাচ্ছিল। র‌্যাব বলছে, শুধু তামান্না ও শহিনুর বেগম নয়। ইয়াবা বহনে একটি মহিলা চক্র রয়েছে। মহিলাদের দিয়ে নিরাপদে ইয়াবা বহন সম্ভব। এ কারণেই ইয়াবা চক্রের সদস্যরা অসহায় নারীদের দিয়ে ইয়াবা পাচার করছে।

যে এলাকা দিয়ে ঢুকছে : জকিগঞ্জ উপজেলার খলাছড়া ইউনিয়নের লোহারমহল, সুলতানপুর ইউনিয়নের অজরগাঁও, ইছাপুর, সুলতানপুর, সহিদাবাদ ও ভক্তিপুর, বারঠাকুরী ইউনিয়নের লাড়িগ্রাম ও ছালেহপুর, জকিগঞ্জ ইউনিয়নের সেনাপতির চক, মানিকপুর ও ছবড়িয়া, কসকনকপুর ইউনিয়নের বলরামেরচক এলাকা দিয়ে ভারত থেকে ইয়াবা ঢুকছে বাংলাদেশে। এর মধ্যে ইয়াবা পাচারে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয় লোহারমহল সীমান্ত এলাকা।

কি ভাবে পাচার হয় : ভারত থেকে বাংলাদেশে ইয়াবা পাচারে ব্যবহার করা হয় উভয় দেশের সীমান্ত নদী কুশিয়ারা ও সুরমা। ভারতের করিমগঞ্জ থেকে পলিথিন ব্যাগে ইয়াবার চালান ঢুকিয়ে লম্বা রশি লাগিয়ে ফেলে দেওয়া হয় নদীতে। এপারে বাংলাদেশ সীমান্তে তখন মাছ ধরার নৌকা নিয়ে অপেক্ষায় থাকে মাদক কারবারিরা। নদীর স্রোতের টানে পলিথিনে থাকা ইয়াবার চালান ভাসতে থাকে। তখন বাংলাদেশের মাদক কারবারিরা কৌশলে সেই চালান তুলে নেয় নৌকায়। আর শুষ্ক মৌসুমে নদীতে পানি কমে গেলে ইয়াবার চালান পলিথিনে ভরে সাঁতরেও পার করা হয়। বর্তমানে বাংলাদেশের জকিগঞ্জের সেনাপতির চকের বিপরীতে ভারতের কাঁটাতারের নিচ দিয়ে গোপন রাস্তা তৈরি করা হয়েছে বলেও একটি সূত্র জানিয়েছে।

এ ব্যাপারে র‌্যাব-৯ এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও মিডিয়া কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে জকিগঞ্জকেই ইয়াবা পাচারের রুট হিসেবে বেছে নিয়েছে মাদক ব্যবসায়ীরা। র‌্যাব মাদকের ব্যাপারে জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করেছে। প্রতিদিনই ইয়াবা ব্যবসায়ীদের আটকের পাশাপাশি গত কয়েকমাসে ইয়াবার বেশ কয়েকটি বড় চালান ধরা হয়েছে। ইয়াবা পাচারের গডফাদারদের খোঁজে বের করতে র‌্যাব তৎপর রয়েছে। আশা করছি শীঘ্রই তাদের আটক করতে সক্ষম হবো।