প্রচ্ছদ > পর্যটন > “সিলেটের নতুন পর্যটন স্পট জৈন্তাপুরের বুজিরবন”

“সিলেটের নতুন পর্যটন স্পট জৈন্তাপুরের বুজিরবন”

পর্যটন সিলেট প্রতিক্ষণ

সময়ের ডাক:বোরখাপরা মেয়েটির মতোই লাজুক তার স্বভাব। নিজেকে প্রকাশে তার তীব্র অনীহা। রূপ-সৌন্দর্য প্রকাশের আকুলতা আর রূপের বড়াইয়ের চিরায়ত নিয়মের সে যেন সম্পূর্ণ বিপরীত। এ কি রূপের অহংকার, না স্বকীয়তার অলঙ্কার, তা বুঝা কষ্টকর। তারপরও ঘোমটা পরে রূপবতী আর কতদিন নিজেকে ঢেকে রাখতে পারে! সময়ের প্রয়োজনে ঠিকই পাগল প্রেমিকেরা একদিন তাকে খুঁজে বের করে নেয়। ঘটেছেও তাই। জনপ্রিয় সার্চ ইঞ্জিন গুগলও এখনো পরিচয় জানে না বুজির বনের। পাঠককে প্রথমবারের মতো সে বনের সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে একাত্তরের কথা।

বুজির বন! নিসর্গের মাঝে লুকিয়ে থাকা এক অপরূপ বন। জলের সাথে তার নিবিড় মিতালি। পানি আসলে বর্ষাকালে সে যেন নবরূপে জেগে ওঠে। আপন সৌন্দর্যের সবটুকু মেলে ধরে। এসময় খুলে পড়ে তার আব্রু। নিজেকে আগন্তুুক আর বেগানাদের থেকে সে লুকিয়ে রাখে ঠিকই কিন্তু নিজের ভুবনের বাসিন্দাদের কাছে সে খুবই উদার, আধুনিক। বনের বিচিত্র সব গাছ, জলচর-স্থলচর-উভচর প্রাণি আর মাছশিকারীদের নিয়ে তার নিজের একান্ত ভুবন। বর্ষার ভাসান পানি তো তার স্বজন, আত্মার আত্মীয়। যৌবনের এ ভরা মৌসুমে সে নিজের সাথে যেন নীল আকাশেরও বন্ধুত্ব পাতায়। মনে হয়, যেন পুরো আকাশ নেমে এসেছে বনের পানির মধ্যে।

বৈশিষ্ট্যগত দিক দিয়ে বুজিরবন একটি ‌’সোয়াম্প বন’। সভ্যতার ছোঁয়া বহির্ভূত প্রাকৃতিক এ বনটি যেন নিসর্গের এক আদর্শ উদ্যান। জলকে কেন্দ্র করে বনটির ’ইকোসিস্টেম’ তথা পুরো অস্তিত্ব নির্ভরশীল। সিলেটের জৈন্তাপুর ও গোয়াইনঘাট উপজেলার একেবারে প্রান্তসীমায় অনেকগুলো হাওরের মধ্যে এক নির্জন স্থানে তার অবস্থান। করিচ ও কাপনা নদী চলে গেছে এ নদীর বুক চিরে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে পুড়াখাই নদীর একটি শাখা। তিন নদীর মিলনস্থলে প্রদীপের নীচে অন্ধকারের মতো বনটি আবহমান থেকে এখনও টিকে আছে।

সিলেট-তামাবিল সড়ক ধরে হরিপুরের পরেই করিচ ব্রিজ। সে সেতু থেকে পশ্চিমদিকে মাত্র ৪ কিলোমিটার দুরত্বের মধ্যেই বনটির অবস্থান। কিন্তু এরকম এক ব্যস্ত স্থান থেকে শতাবব্দীর পর শতাব্দী কিভাবে এটি যে পর্যটকদের দৃষ্টির আড়ালে থেকে গেল-সে এক রহস্য। ভৌগলিক বিচ্ছিন্নতা আর দুর্গমতার কারণে এমনটি হয়েছে বলে মনে হয়। বনের বুক চিরে চলে যাওয়া নদীপথে গেলে দেখা যায়, হিজল-করচ-জারুল-বরুন-শেওড়া-বুরি আর কদমের লম্বা লম্বা সারি। গাছগুলো একটি আরেকটিকে ঘিরে ধরেছে আঞ্জাআঞ্জিভাবে। শতবর্ষী একেকটি হিজলগাছ নিজের ডালপালা আর পাতা দিয়ে অনেক জায়গাজুড়ে অবস্থান করছে। ভাবখানা এমন যে প্রত্যেকটি গাছ এক একটি জমিদার! সন্ধ্যার আলো-আধাঁরীতে এক একটি হিজল গাছকে মনে হয় গভীর ধ্যানে মগ্ন একেকজন সন্ন্যাসী। বনের ভেতরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, মুর্তা, বেত, হুগলা আর শনের ঘন বন। বড়গাছগুলোর নিচের এসব ঝোপঝাড় দেখলে মনে হতে পারে, ছোটবনগুলোকে যেন এরা মায়ের মতো আদরের চাদরে ঢেকে রেখেছে। বর্ষার ভাসান পানিতে মাথা উচুঁ করে কোন রকমে এগুলো জীবনের সাথে যুদ্ধ করছে। বনের পশ্চিম-উত্তর দিকে রয়েছে ইকড়ের বিশাল হাওর। দিগন্তের ওপারের খাসিয়া-জৈন্তায়া পাহাড় তৈরি গভীর দৌত্যনা।

বুজিরবন জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ একটি বন। বিচিত্র প্রজাতির উদ্ভিদ, জলচর ও স্থলচর প্রাণির এক সমৃদ্ধ আবাসস্থল এ বন। বনের মধ্যে দেখা মেলে উদবিড়াল, গেছো ইদুর, কাঠবিড়ালী, খেকশিয়ালসহ নানা প্রজাতির প্রাণি। অনেক মেছোমাঘও বনের মধ্যে বসবাস করে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় জেলেরা। চিল, ঈগল, ডাহুক, কানাবক, বালিহাস আর নানা প্রজাতির পাখি দাপিয়ে বেড়ায় বনের মধ্যে। বিশেষ করে, শীতকালে পরিযায়ী পাখীর কলকাকলীতে মুখরিত থাকে এ বন। দেশীয় নানা প্রজাতির মাছে ভরপুর বনটি। স্থানীয় জেলেরা এ বনের মধ্যে নানা প্রকার ফাঁদ পেতে মাছ শিকার করে। বনের মধ্যে ঘোরাঘুরির সময় নিঃশব্দ ভেদ করে জেলেদের সাংকেতিক শব্দে পরস্পরের সাথে যোগাযোগ করে। নানা প্রকার কীটপতঙ্গ খেতে বনের মধ্যে ভিড় জমায় মাছের দল। সবমিলিয়ে নিজের সবকিছু নিয়ে বনটি যেন এক তৃপ্ত সুখীর প্রতিচ্ছবি।

সে বনটির কোন খোঁজ পাওয়া গেলনা বন বিভাগের কোনো নথিপত্রে। গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুরের প্রশাসনের সরকারি দলিল-দস্তাবেজ ঘেঁটেও বনটির কোনো হদিস মিলল না। অবশ্য ২০ একরের উর্ধ্বে জলমহালের একটি তালিকায় বুজির বিল নামে একটি স্থানের উল্লেখ পাওয়া গেল যেটি জৈন্তাপুরের ফতেহপুর ইউনিয়নে অবস্থিত। প্রাচীনকালের কোনো এক সময়ে প্রকৃতি যেভাবে এটিকে গঠন করেছিল, আজও বনটি সেভাবে আছে। নিজের অফুরন্ত সম্পদ দিয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এটি মানুষের প্রয়োজন মিটিয়েছে, ভারসাম্য রক্ষা করেছে পরিবেশ ও প্রকৃতির। হেমু নামক গ্রামটির মানুষের কাছে বনটি সুপরিচিত হলেও বাইরের মানুষের কাছে এটি এখনও অজানাই রয়ে গেছে। ব্যাপক প্রচার ও যাতায়াতের উন্নতি ঘটালে এটি পর্যটকদের কাছে এক আকর্ষণীয় গন্তব্য হতে পারে।