প্রচ্ছদ > সিলেট প্রতিক্ষণ > রাজনীতি না বুঝেও ‘বলির পাঠা’ এমসির ছাত্রাবাসের শিক্ষার্থীরা

রাজনীতি না বুঝেও ‘বলির পাঠা’ এমসির ছাত্রাবাসের শিক্ষার্থীরা

সিলেট প্রতিক্ষণ সিলেট শীর্ষ

সময়ের ডাক : হবিগঞ্জের মাধবপুরের ছেলে রাফি (ছন্দনাম)। দরিদ্র কৃষক পরিবারের ছেলে হওয়ায় শহরে মেস ভাড়া করে থাকার সামর্থ্য নেই। যেকারণে মেধার ভিত্তিতেই এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে থাকার সুযোগ হয় তার। ছাত্রাবসে অল্প খরচেই নিশ্চিন্তে লেখাপড়া করে স্বপ্ন পূরণের রুপালি সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল রাফি।

কিন্তু মঙ্গলবার আকস্মিক ছাত্রাবাস বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা শুনে রীতিমতো আতকে উঠে সে। এমন সময় কোথায় যাবে, থাকার জন্য শহরে কোন আত্মীয়ের বাসাও নেই। আবার হঠাৎই মেস কিংবা বাসা পাওয়াও সম্ভব না। ঐদিকে তার পরীক্ষা চলছে। বাড়িতে চলে গেলে বাবার স্বপ্নটি ও যে শেষ হয়ে যাবে। এমন হাজারো কথা মনে করে চোখ ভরা জ্বল নিয়েই ব্যাগ গুছাচ্ছে পাড়াগাঁয়ের ছেলে রাফি। পরক্ষণেই বইপত্র নিয়ে অজানা এক উদ্দেশ্যের দিকে পা বাড়ায় সে।

দু’হাতে বার বার চোখের জল মুছে পেছন ফিরে তাকায় প্রিয় ছাত্রাবাসটির আঙ্গিনায়। রাফি জানেনা কোথায় যাচ্ছে সে। একরাশ হতাশা নিয়ে কেবল হেঁটেই চলছে আগামীর সম্ভাবনাময় মেধাবী একটি ছাত্র। বলছিলাম সিলেটের ঐতিহ্যবাহী মুরারিচাঁদ কলেজের এক শিক্ষার্থীর ছাত্রাবাস ত্যাগ করার মুহূর্তের ছোট্ট একটি উদাহরণ।

রাফির মতো এরকম প্রায় তিনশ’র বেশি শিক্ষার্থী উদ্দেশ্যহীন মঞ্জিলের দিকে পা রাখছেন। আপন জায়গা হারিয়ে তারা হতাশার সাগরে নিমজ্জিত। কিছু না করেও তারাই হয়েছেন বলির পাটা। রাজনীতির ‘র’ ও যারা বুঝেনা, প্রতিহিংসার রাজনীতি দ্বারা সেই মেধাবী শিক্ষার্থীরাই এর দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছেন।

গত কিছুদিন ধরেই ছাত্রাবাসে বৈধ-অবৈধ, নিয়মিত-অনিয়মিত কিংবা বহিরাগত সম্পর্কিত বিষয়ে এমসি কলেজ ছাত্রলীগের দুটি পক্ষের মধ্যে একটা থমথমে ভাব বিরাজ করছিল। সাথে সিলেট সরকারি কলেজ ছাত্রলীগের উস্কানি ও হস্তক্ষেপ পরিস্থিতি আরো বেসামাল করে তুলে। এমসি কলেজের বিষয়ে বহিরাগতদের হস্তক্ষেপ কেন? অবৈধরা ছাত্রাবাসে কেন? এমন প্রশ্নে বিবাবমান দুটি পক্ষের উত্তেজনা দিন দিন তুঙ্গে উঠতে থাকে। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ঘটে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার মতো ঘটনাও।

যার প্রেক্ষিতে সোমবার রাতে ছাত্রলীগের দুটি গ্রুপের সমর্থকরা এমসি ছাত্রাবাস ও এর আশে পাশে অস্ত্রের মহড়া শুরু করে। বহিরাগতরা ছাত্রাবাসে ঢোকার চেষ্টা করলে সেটি প্রতিহত করে ভেতরে থাকা ছাত্রলীগের আরেকটি গ্রুপ।

এমন টান টান উত্তেজনার মধ্যে এমসি ছাত্রাবাসে এক অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পরে রাতে অধ্যক্ষ নিতাই চন্দ্র চন্দ, হোস্টেল সুপার, কলেজের শিক্ষক, র‍্যাব-৯, শাহপরান থানা পুলিশসহ ছাত্রাবাসে গেলে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়। পরে বিবাদমান দুটি পক্ষের সাথে কথা বলে মিমাংসার চেষ্টা করলেও পারা যায়নি। এদিকে রাত বাড়ার সাথে সাথে উল্টো পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হলে এক পর্যায়ে ছাত্রাবাস বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয় কলেজ প্রশাসন। প্রতিহিংসার রাজনীতির কাছে যেন অসহায় খোদ কলেজ প্রশাসন নিজেই।

পরবর্তীতে অধ্যক্ষের স্বাক্ষরিত এক নোটিশের মাধ্যমে মঙ্গলবার দুপুর ২ টার ভেতর ছাত্রাবাসে থাকা সব শিক্ষার্থীদের হোস্টেল ত্যাগ করার নির্দেশ দেয় এমসি কতৃপক্ষ। এ সম্পর্কে কলেজ অধ্যক্ষ প্রফেসর নিতাই চন্দ্র চন্দ সিলেটভিউকে বলেন, ছাত্রাবাসে কিছুটা অস্থিরতা বিরাজ করায় শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার স্বার্থে আপাতত ছাত্রাবাসটি বন্ধ করা হয়েছে। পরবর্তীতে কোন সিদ্ধান্ত হলে সকলকে জানিয়ে দেওয়া হবে।

হঠাৎই কলেজ প্রশাসনের এমন ঘোষণায় রীতিমতো আতকে উঠে ছাত্রাবাসে থাকা সাধারণ শিক্ষার্থীরা। পরে অনিচ্ছা সত্বেও স্বপ্ন পূরণের কক্ষটি ত্যাগ করে যে যার মতো করেই বেড়িয়ে যায়। এসময় ছাত্রাবাসে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। এমসির অনেক শিক্ষার্থীকেই নিরবে চোখ মুছতে দেখা যায়। দুপুর দুইটার ভেতরই ছাত্রশুণ্য হয়ে যায় ১৯২০ সালে প্রতিষ্ঠিত এমসি কলেজের এই ছাত্রবাসটি। বালুচরের ছাত্রাবাসটি বর্তমানে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

ছাত্রাবাস ত্যাগ করার সময়ে অনেককেই স্যোশাল মিডিয়ায় আবেগঘন পোস্ট দিতে দেখা যায়। হৃদয় নামে একজন লিখেন, অপরাধ না করেই ভুক্তভোগী হতে হলো। জানিনা কোথায় যাব, কি করব। আমাদের নিয়ে এমন দাবা খেলার বিচার একদিন সৃষ্টিকর্তা করবেন।

এনামুল নামের একজন তার ওয়ালে লিখেন, রাজনীতি না বুঝে ও আজকে আমাদের মতো সাধারণ শিক্ষার্থীদেরই বলির পাঠা হতে হল।

বিষয়টি নিয়ে এমসি কলেজ রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগের এক শিক্ষক বলেন, মুলত ছাত্ররা তাদের দলের মুল যে রাজনৈতিক মতাদর্শ রয়েছে, তার যথার্থ প্রতিফলন ঘটাতে পারছে না। যেকারণে নিঃস্বার্থের বিপরীতে নিজেদের মধ্যে কোন্দল ও গ্রুপিংয়ের সৃষ্টি হচ্ছে। ঘটছে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। যার ফলে শিক্ষাঙ্গনে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এর দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

রাষ্ট্র বিজ্ঞানের এই শিক্ষক বলেন, কেন্দ্রীয়ভাবে বিষয়গুলো সুরাহার কথা না ভাবলে আদর্শগত দিক থেকে ভবিষ্যতে ভয়াবহ সংকটে পড়তে হবে দেশের ছাত্ররাজনীতিকে।