প্রচ্ছদ > আন্তর্জাতিক > বাতাসে লাশের গন্ধ, গণকবর

বাতাসে লাশের গন্ধ, গণকবর

আন্তর্জাতিক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : একদিকে আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে, তার অদূরেই পলিথিনের ব্যাগে মোড়ানো সারি সারি লাশ। আত্মীয়স্বজনের কাছে হস্তান্তরের জন্য রাখা হয়েছে লাশগুলো। কেউ খুঁজে পাচ্ছে, কেউ পাচ্ছে না। কারণ বহু পরিবারের সবাই মারা গেছেন। লাশ নেয়ার কোনো লোক নেই।

তিন দিন পেরিয়ে যাওয়ায় লাশগুলো থেকে উৎকট দুর্গন্ধ ছড়ানো শুরু হয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার পালু শহরে ভয়াবহ ভূমিকম্প ও সুনামিতে মৃত ব্যক্তিদের লাশ থেকে রোগজীবাণু ছড়ানোর আশঙ্কায় গণকবর খোঁড়ার ঘোষণা দেয় দেশটির সরকার। খবর ওয়াশিংটন পোস্ট ও আলজাজিরার।

শুক্রবার ইন্দোনেশিয়ার সুলাওয়েসি দ্বীপের পালু শহরে সন্ধ্যার দিকে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়। ভূমিকম্পের পর সুনামির ফলে সৃষ্ট প্রায় ২০ ফুট উঁচু ঢেউ পালু শহরকে ভাসিয়ে দেয়। মৃত মানুষের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২০৩ জনে। হাজার হাজার ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে।

বিদ্যুৎ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ভূমিধসে শহরের প্রধান সড়ক বন্ধ হয়ে গেছে। লোকজন খোলা স্থানে অবস্থান করছে। হাসপাতালের বাইরে খোলা আকাশের নিচে চিকিৎসা চলছে আহতদের।

পালু শহরের মামবোরো হেলথ ক্লিনিকের বাইরে এক কোনায় স্ট্রেচারে পাঁচ বছরের একটি মেয়েশিশুকে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। তার পা ভাঙা। ক্লিনিকের চিকিৎসক সাসোনো জানান, শিশুটির পরিবার কোথায়, তা তারা জানতে পারেননি। শিশুটি কোনো কিছু মনে করতে পারছে না।

এদিকে ক্লিনিকে বিদ্যুৎ নেই। নেই চিকিৎসার সরঞ্জামও। রোববার দেশটির প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো দুর্যোগ এলাকা পরিদর্শন করেছেন। তিনি দিন-রাতজুড়ে উদ্ধারকাজ চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন। ইন্দোনেশিয়ার বাতাসে প্রচণ্ড দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে।

ডা. সাসোনো বলেন, লাশ থেকে রোগজীবাণু ছড়ানো ঠেকাতে গণকবরে লাশগুলোকে দাফন করা হবে। তিনি বলেন, ‘লাশগুলো স্বজনদের হাতে তুলে দেয়ার জন্য আমরা অপেক্ষা করছিলাম, কিন্তু আমরা আর অপেক্ষা করতে পারছি না।’

ইন্দোনেশিয়ার দুর্যোগবিষয়ক সংস্থা গণকবরের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। রোববার রাতে একটি গণকবর খোঁড়া হয়েছে। ওই কবরে অন্তত ৩০০ মরদেহ সমাহিত করা হয়েছে। পালু শহরের একটি ফাঁকা মাঠে গণকবর দেয়ার জন্য প্রায় ১৩০০ জনের জায়গা খোঁড়া হয়েছে।

ইন্দোনেশিয়ার সরকার সোমবার জানিয়েছে, ভূমিকম্প ও সুনামিকবলিত সুলাওয়েসির তিনটি কারাগার থেকে এক হাজার দু’শ বন্দি পালিয়ে গেছে। বিচার মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা পুগু ইউতামি পালু ও ডংগালার কারাগার থেকে বন্দি পালানোর কথা নিশ্চিত করেছেন।

তিনি বলেন, ‘ভূমিকম্পের ভয়ে তারা পালিয়ে গেছে। কারণ এটি তাদের জীবন-মরণের প্রশ্ন।’

এদিকে ইন্দোনেশিয়ার সুনামির শক্তি ও ধ্বংসযজ্ঞ দেখে বিস্মিত হয়েছেন বিজ্ঞানীরা। তারা বলছেন, এই মাত্রার ভূমিকম্পে এমন ধ্বংসাত্মক ঢেউয়ের সৃষ্টি হওয়ার কথা নয়।

ক্যালিফোর্নিয়ার হাম্বলডট স্টেট ইউনিভার্সিটির শিক্ষক ও ভূপদার্থবিদ জ্যাসন প্যাটন বলেন, ‘আমরা ধারণা করছিলাম ভূমিকম্পে হয়তো সুনামি হতে পারে। কিন্তু এত বড় হবে বলে ধারণা করিনি। এমন ঘটনা যখন ঘটে তখন আমরা এমন নতুন কিছু আবিষ্কার করি যা অতীতে পর্যবেক্ষণ করা হয়নি।’

ইউনিভার্সিটি অব পিটার্সবার্গের অধ্যাপক লুইজ কমফোর্ট জানান, ‘সুনামি শণাক্তকরণে ইন্দোনেশিয়া এখনও শুধু সিসমোগ্রাফ, গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম ডিভাইস ও টাইড গজ ব্যবহার করে। এসবের কার্যকারিতার সামর্থ্যে ঘাটতি রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘প্রযুক্তির যুগে ইন্দোনেশিয়া রয়েছে বিপজ্জনক অবস্থায়। সুনামির সময় প্রযুক্তি কাজে লাগাতে না পারাটা দুঃখজনক।’