দুটি পাতা একটি কুঁড়ির দেশ সিলেট

এম আর টুনু তালুকদার:  বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে ব্রিটিশসহ বিভিন্ন জাতি বিভিন্ন সময়ে এদেশে পদার্পন করেছে। বাংলাদেশ স্বল্প আয়তনের দেশ হলেও পৃথিবীতে এর পর্যটন শিল্প আজ বৃহত্তর শিল্প হিসেবে সমাদৃত। এদেশের পর্যটন শিল্পে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ও জীব বৈচিত্র্যে ঐশ্বর্যমন্ডিত পূণ্যভূমি সিলেট বিভাগের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

যান্ত্রিক জীবন থেকে একটু স্বস্তি পেতে প্রকৃতিকে ছুয়ে দেখার জন্য প্রতিদিনই দেশি বিদেশী পর্যটকরা ছুটে আসছে এই দুটি পাতা একটি কুঁড়ির দেশ সিলেটে।

সিলেট ঃ বাংলার সৌন্দর্য যেখানে দাড়িয়ে আছে প্রতিটি স্থানে
নৈসর্গিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধশালী এই প্রাণের ভূমি সিলেট কে নিয়ে রয়েছে আমাদের সিলেটিদের অকৃত্রিম ভালবাসা, রয়েছে গর্ব, ঠিক যেমন রয়েছে চা বাগানের প্রতিটি রন্ধে রন্ধ্র্রে আমাদের হৃদস্পন্দন।

ঈদের ছুটি, শীতকালে এমনকি বর্ষা মৌসুমেও বর্তমানে সিলেটের অর্ধশত পর্যটন ও বিনোদন কেন্দ্র পর্যটকদের ভিড়ে মুখরিত হয়ে উঠছে। এ অঞ্চলের ছোট বড় হোটেল মোটেল রিসোর্ট রয়েছে পাঁচ শতাধিক। তারকামানের হোটেল রিসোর্ট রয়েছে ১০টির মতো এর মধ্যে অন্যতম মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার পাঁচ তারকা Grand Sultan হবিগঞ্জ জেলার বাহুবল উপজেলার পাঁচ তারকা The palace Luxury Resort.

 

সিলেট বিভাগের সিলেট জেলায় অবস্থিত প্রকৃতি কন্যা জাফলং আর লালাখাল। তাদের নির্জন মনকড়া সৌন্দর্যে বিকশিত স্বচ্ছ জলরাশির দীর্ঘ নৌভ্রমন পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয়। জাফলং এর মতো তামাবিলও সিলেট অঞ্চলের সীমান্তবর্তী এলাকা যেখান থেকে সরাসরি ভারতের পাহাড়, পর্বত, ছোট ছোট অনেক ঝর্না দেখা যায় যা গোধুলির সময় চমৎকার লাগে। সিলেট থেকে ভোলাগঞ্জের দূরত্ব মাত্র ৩৩ কিলোমিটার। ভোলাগঞ্জের রোপওয়ের আয়তন প্রায় ১০০ একর যে কারনে স্থানটি পর্যটকদের কাছে আকর্ষনীয়। এছাড়া সিলেটের সুন্দরবন নামে পরিচিত মিঠাপানির রাতারগুল পর্যটন কেন্দ্রে ঢল নামে পর্যটকদের।

সিলেট মাজার
আধ্ন্যাতিক নগরী সিলেট পর্যটন শিল্পের কেন্দ্রবিন্দু। হযরত শাহজালাল ও শাহপরানের মাজারকে কেন্দ্র করে সিলেট শহরে গড়ে উঠেছে এক সম্ভাবনাময় পর্যটন শিল্প।

এছাড়া ওসমানী শিশু উদ্যান, ক্বিন ব্রিজ, আলী আমজাদের ঘড়ি, নয়নাভিরাম চা বাগান, অ্যাডভেঞ্চার ওয়ার্ল্ড, জাকারিয়া সিটি, খাদিম নগর জাতীয় উদ্যান, ড্রিম ল্যান্ড ও নগরীর অন্য অন্য পর্যটন কেন্দ্রসমুহ এখন পর্যটকদের মিলন মেলা। এছাড়া সিলেট জেলার লোভাছড়া, বিছানা কান্দি, পান্থুমাই, জৈন্তাপুর আলুবাগান পর্যটকদের উল্লেখযোগ্য স্থান।

মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার মাধবকুন্ড জলপ্রপাত ও ইকোপার্ক,পরীকুন্ড জলপ্রপাত,হাকালুকি হাওড়; মাধবপুর উপজেলার মাধবপুর লেক, এছাড়া চায়ের রাজধানী শ্রীমঙ্গল উপজেলার অপরুপ চা-বাগান। যত দূর চোখ যায় বিস্তৃত চা বাগান চোখ জুড়িয়ে দেয়।

সিলেট চা বাগান, শ্রীমঙ্গল এলাকা

শীতেশবাবুর চিড়িয়াখানা, নীলকন্ঠ টি কেবিন (সাত রঙের চা পাওয়া যায়), বাংলাদেশ চা গবেষণা ইন্সিটিটিউট, কমলগঞ্জ উপজেলার লাউয়াছড়া বন ও হাম হাম জলপ্রপাত,পর্যটকদের কাছে খুবই জনপ্রিয়।

 

সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর, টাঙ্গুয়ার হাওড়, টেকের ঘাট, বারিক্কার টিলা, মরমীকবি হাসনরাজার বাড়ি ও যাদুঘর ।

সিলেটঃ পুরো বাংলার প্রতিচ্ছবি
হবিগঞ্জ জেলার ফ্রুট ভ্যালী (এটি ফলের বাগান প্রায় ৩ একর জায়গা জুড়ে বিলুপ্তপ্রায় ২০০ জাতের ফলের গাছ রয়েছে) বিতঙ্গল আখড়া (বৌদ্ধ ধর্মালম্বীদের জন্য অন্যতম তীর্থস্থান এই আখড়া) বানিয়াচং উপজেলা সদর থেকে ১২ কি.মি. দক্ষিণ-পশ্চিম হাওড় পাড়ে অবস্থিত।এতে ১২০ জন বৈষ্ণবের জন্য ১২০ টি কক্ষ রয়েছে।

এ আখড়ায় বিভিন্ন ধরণের ধর্মীয় উৎসব হয়। এর মধ্যে কার্তিকের শেষ দিনে ভোলা সংক্রান্তি উপলক্ষে কীর্তন, ফাল্গুনের পূর্ণিমা তিথিতে দোল পূর্ণিমার ৫ দিন পর পঞ্চম দোল উৎসব, চৈত্রের অষ্টমী তিথিতে আখড়া সংলগ্ন ভেড়ামোহনা নদীর ঘাটে ভক্তগণের পূণ্যস্নান ও বারুনী মেলা, আষাড় মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে রথযাত্রা উল্লেখযোগ্য। আখড়ায় আছে ২৫ মণ ওজনের শ্বেত পাথরের চৌকি, পিতলের তৈরি সিঙ্ঘাসন, সুসজ্জিত রথ, রৌপ্য পাত্র ও সোনার মুকুট। মধ্যযুগীয় স্থাপত্যশৈলীর অনুকরণে নির্মিত এই আখড়াটি পর্যটকদের জন্য দর্শনীয় স্থান।)

লাউয়াছড়া ও সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান
সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান (চুনারুঘাট উপজেলার রঘুনন্দন পাহাড়ে অবস্থিত এই উদ্যান ঢাকা থেকে সড়ক পথে এর দূরত্ব ১৩০ কিলোমিটার। এ উদ্যানে ১৯৭ প্রজাতির জীব-জন্তু রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২৪ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ১৮ প্রজাতির সরিসৃপ, ৬ প্রজাতির উভচর। আরো আছে প্রায় ১৫০-২০০প্রজাতির পাখি।

এটি বাংলাদেশের একটি সংরক্ষিত বনাঞ্চল এবং পাখিদের একটি অভয়াশ্রম। বনে লজ্জাবতী বানর, উল্লুক (Gibbon), চশমা পরা হনুমান (Langur), কুলু বানর (Macaque), মেছো বাঘ, মায়া হরিণ (Barking Deer),কাওধনেশ বনমোরগ, লালমাথাট্রগন, কাঠঠোকরার, ময়না, ভিমরাজ, শ্যামা, ঝুটিপাঙ্গা, শালিক, হলুদ পাখি, টিয়া প্রভৃতির আবাস রয়েছে। সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের ভিতর সাতটি ছড়া বা ঝর্না আছে যেখান থেকে এর নামকরণ করা হয়েছে সাতছড়ি।

দেশের ১০ টি জাতীয় উদ্যানের মধ্যে এটি অন্যতম। সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান একটি ট্রপিকেল রেইন ফরেস্ট বা মিশ্র চির সুবুজ এবং পাতাঝরা বন।

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান পর্যটকদের কাছে আরেকটি জনপ্রিয় জায়গা। প্রকৃতি কে খুব কাছে থেকে দেখতেই সকলের এতো আগ্রহ। লাউয়াছড়া বনে বেশি দেখা যায় বন্যপ্রাণী চিত্রগ্রাহকদের। পাখিদের একটি অন্যতম অভয়াশ্রম এই বনাঞ্চল তাই কখনোই মানবশুন্য হয়না।

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান। বন্য প্রানীর অভয়াশ্রম

ইকো ট্যুর গাইডের সাহায্য নিয়ে জীব বৈচিত্র্যে ভরপুর সাতছড়ি উদ্যানে হাইকিং করলে এর অপূর্ব বনশ্রী উপভোগ করলে সম্ভব। এখানে হাজারো পর্যটক প্রাকৃতিক দৃশ্য পরিভ্রমণে আসেন।

রেমা- ক্যালেঙ্গা বনাঞ্চল
রেমা- ক্যালেঙ্গা দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এ বনাঞ্চলে রয়েছে ৩৭ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ১৬৭ প্রজাতির পাখি, ৭ প্রজাতির উভচর, ১৮ প্রজাতির সরিসৃপ, বিলুপ্ত প্রায় উতবা, কাইম, বনমোরগ, বানর, হনুমান , হরিণ, সাপ, মৌমাছি, চশমা বানরসহ ৬০ প্রজাতির বন্যপ্রাণী এবং ৬৩৮ প্রজাতির উদ্ভিদ।

 

নয়নাভিরাম ছোট-বড় পাহাড়, টিলা ও ১টি লেক, ২শ ফুট উঁচু পর্যবেন টাওয়ার যা পর্যটকদের খুব সহজেই আকৃষ্ট করতে পারে।লক্ষী বাওর জলাবন (রাতারগুলের মত জলাবন) পর্যটকদের জন্য দৃষ্টি নন্দন ও আকর্ষণীয় স্থান।

 

সর্বপরী দুটি পাতা একটি কুড়ির দেশ সিলেট অনন্য বৈচিত্রের অধিকারী যা বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সিলেটের পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন ও এর সঠিক উপস্থাপনের উপর আমাদের সকলের দৃষ্টি রাখতে হবে। কেননা, পৃথিবীতে পর্যটন শিল্প এখন বৃহত্তম ও বহুমাত্রিক শিল্প যা বিকাশের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সহ নানাভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়ন করা সম্ভব।