প্রকাশ্যে চালিয়ে যাচ্ছেন ব্যবসা হারিছ চৌধুরী, আছেন পাঞ্জাব!

সময়ের ডাক ডেস্ক:: বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে আলোচিত হাওয়া ভবনের আশির্বাদপুষ্ট নেতা আবুল হারিছ চৌধুরী বেঁচে আছেন নাকি মারা গেছেন, এ নিয়ে জল অনেক ঘোলা হয়েছে। তৎকালীন সময়ের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার এই প্রতাপশালী রাজনৈতিক সচিব দীর্ঘদিন একেবারেই অন্তরালে ছিলেন। যার ফলে ছড়িয়ে পড়েছিল তার মৃত্যুর গুজব। তবে হারিছ চৌধুরীর ঘনিষ্ট ও আস্থাভাজন সূত্র বলছে, তিনি এখন ভারতের পাঞ্জাবে রয়েছেন। সেখানে তিনি প্রকাশ্যে চালিয়ে যাচ্ছেন ব্যবসা। সেখানকার একজন আত্মীয়ের সাথে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে তিনি ব্যবসা পরিচালনা করছেন বলে সূত্র জানিয়েছে।

হারিছ চৌধুরীর গ্রামের বাড়ি সিলেটের কানাইঘাট উপজেলায়। তার নানার বাড়ি ভারতের করিমগঞ্জে। নানার বাড়িতে যাওয়া-আসার সুবাদে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল সম্পর্কে আগে থেকেই জানাশোনা ছিল তার। চারদলীয় জোট সরকারের বিদায়ের পর সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় এলে পতন ঘটে হাওয়া ভবন সা¤্রাজ্যের। একের পর এক দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হতে থাকেন হারিছ চৌধুরী। এরপর নিজেকে রক্ষা করতে ২০০৭ সালের ২৯ জানুয়ারি জকিগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে রাতের আঁধারে ভারতে পালিয়ে যান বিএনপি সরকারের দাপুটে এই নীতিনির্ধারক। প্রায় এক দশক পেরিয়ে গেলেও এরপর আর দেশমুখী হননি তিনি। তবে গুজব রয়েছে, ২০১৫ সালে গোপনে দেশে এসেছিলেন হারিছ চৌধুরী। কিছুদিন সিলেটে অবস্থান করে নিজের সহায়-সম্পত্তি বিশ^স্ত ব্যক্তিদের কাছে বুঝিয়ে দিয়ে ফের চলে যান ভারতে।

সিলেটে হারিছ চৌধুরীর আস্থাভাজন ও ঘনিষ্ট সূত্র  জানায়, ২০১৫ সালের পর থেকে প্রায় দুই বছর সময় দেশে কারোর সাথেই যোগাযোগ করেননি হারিছ চৌধুরী। তখন তিনি মারা গেছেন বলে গুজব ছড়িয়ে পড়ে। তবে গত বছর থেকে দেশে নিজের বিশ^স্ত ও ঘনিষ্টজনদের সাথে ফের যোগাযোগ রাখছেন তিনি। দেশের রাজনীতি ও রেখে যাওয়া সম্পত্তির খবরও রাখছেন হারিছ চৌধুরী।

হারিছ চৌধুরীর ঘনিষ্ট সিলেট বিএনপির এক নেতা জানান, বিভিন্ন দেশ ঘুরে বর্তমানে ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশে থিতু হয়েছেন আবুল হারিছ চৌধুরী। সেখানে তার মামার বাড়ির আত্মীয়স্বজনদের সাথে পুরনো ব্যবসা রয়েছে। হারিছ চৌধুরীও জড়িয়ে পড়েছেন ব্যবসায়। তবে ঠিক কি ধরনের ব্যবসার সাথে হারিছ চৌধুরী জড়িত, তা খোলাসা করতে চাননি তিনি। পাঞ্জাবে কোন রাখঢাক না করে প্রকাশ্যেই চলাফেরা করেন হারিছ চৌধুরী। সেখানে বাংলাদেশি কিছু ব্যবসায়ী থাকলেও হারিছ চৌধুরীর চেহারা ও বেশভূষায় খানিকটা পরিবর্তন আসায় তাকে কেউই চিনতে পারেন না। সেখানকার ব্যবসায়ীরা তাকে ভারতীয় নাগরিক হিসেবেই জানেন। সেখানে কোথাও পরিচয় দিতে হলে আসামের করিমগঞ্জে থাকা মামার বাড়ির ঠিকানা ব্যবহার করেন হারিছ চৌধুরী।

সূত্র জানায়, প্রায় ছয় মাস আগে নিজের আস্থাভাজন ও ঘনিষ্ট সিলেট বিএনপির এক নেতার সাথে ইন্টারনেট কলিংয়ের মাধ্যমে যোগাযোগ করেন হারিছ চৌধুরী। প্রায় আধা ঘন্টার সেই আলাপে রাজনীতি, দেশে ফেরা না ফেরা প্রভৃতি বিষয় নিয়ে আলাপ করেন তিনি। ওই সময় বিএনপি নেতাকে তিনি জানান, পাঞ্জাবে তিনি সুস্থ আছেন এবং ব্যবসাবাণিজ্য করছেন। তিনি দেশে ফিরতে চান। দেশে ক্ষমতার পটপরিবর্তন ঘটলে এবং খালেদা জিয়াই বিএনপির নেতৃত্বে থাকলে তিনি দেশে ফিরবেন বলে জানান।

হারিছ চৌধুরীর স্ত্রী ও সন্তানরাও রয়েছেন দেশের বাইরে। তার স্ত্রী একমাত্র মেয়েকে নিয়ে যুক্তরাজ্যে রয়েছেন। সেখানে ব্যারিস্টারি করছেন মেয়ে। হারিছ চৌধুরীর ছেলে বর্তমানে নরওয়েতে একটি তেল কোম্পানিতে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সন্তানদের সাথে হারিছ চৌধুরীর নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে।

সূত্র বলছে, বাংলাদেশ থেকে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর দীর্ঘদিন নিজের নানাবাড়ি আসামের করিমগঞ্জে আত্মগোপন করে ছিলেন হারিছ চৌধুরী। তিনি ভারতের যাওয়ার কয়েকদিন পর তার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও টাকা বস্তায় ভরে সীমান্ত দিয়ে সেখানে পাঠানো হয়। করিমগঞ্জ থেকে মেঘালয়ে গিয়ে কিছুদিন থাকেন তিনি। পরে ভারত থেকে যুক্তরাজ্যে যান। সেখান থেকে ইরানে ভাই আবদুল মুকিত চৌধুরীর কাছে যান হারিছ চৌধুরী। কয়েক বছর সেখানেই ছিলেন হারিছ চৌধুরী। মুকিত চৌধুরী ইরানে একটি সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক ছিলেন। তবে মুকিত চৌধুরী মারা যাওয়ার পর আর ইরানমুখী হননি হারিছ। যুক্তরাজ্যে থাকার ইচ্ছা থাকলেও সেখানে প্রচুর বাংলাদেশি থাকায় নিরাপদ মনে করেননি তিনি। ফিরে আসেন ভারতে। পাঞ্জাবে থিতু হলেও প্রায়ই তিনি মামার বাড়ি করিমগঞ্জে আসা-যাওয়া করেন। একইসাথে দেশে সহায়-সম্পত্তিরও খোঁজ রাখেন তিনি।

হারিছ চৌধুরীর ঘনিষ্ট সূত্র জানায়, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মামলায় আসামি হওয়ার আগে দেশে আসার পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। এজন্য বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্যের মাধ্যমে খালেদা জিয়ার অনুমতি চেয়েছিলেন হারিছ চৌধুরী। কিন্তু ওই সময় দেশে রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে তাকে দেশে ফিরতে নিষেধ করেন খালেদা।

দেশে ফিরতে চেয়েছেন একাধিকবার: ২০০৭ সালে দেশ ছাড়ার পর বিভিন্ন সময়ে দেশে ফেরার চেষ্টা করেছেন হারিছ চৌধুরী। ২০১০ সালে একবার দেশে ফেরার পরিকল্পনা করেও পিছু হটেন তিনি। পরবর্তীতে একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলার মামলায় জড়ানোর আগেও একবার দেশে আসতে চেয়েছিলেন তিনি। তবে মামলায় জড়ানোয় আর দেশমুখী হননি। পাঁচ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে সিলেট-১ আসনে হারিছ চৌধুরীকে প্রার্থী করার দাবি জানিয়ে পোস্টারিং হয়েছিল। তখন তিনি দেশে ফিরে নির্বাচনে অংশ নেয়ায় আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু বিএনপি সে নির্বাচন বর্জন করায় সেবারও ভেস্তে যায় তার দেশে আসা। সিলেটে হারিছ চৌধুরীর ঘনিষ্টজনরা জানান, বিভিন্ন সময়ে দেশে আসার পরিকল্পনা করলেও দলের হাইকমান্ড থেকে গ্রিন সিগন্যাল না পাওয়া, একের পর এক মামলা, প্রতিকূল পরিস্থিতি ও পরিবারের সদস্যদের আপত্তিতে ফিরতে পারেননি তিনি।