শেভরণ নিরাপত্তা কর্মিদের আকুতি সুন্দরভাবে বাঁচতে সহযোগিতা করুন

সময়ের ডাক: বিদেশী কোম্পানিতে চাকুরী হচ্ছে, এমন আশ্বাসে মধ্যপ্রাচ্যসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যাওয়ার সুযোগ থাকলেও যাননি। থেকে গিয়েছিলেন দেশে। সততা ও নিষ্ঠার সাথে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনকারী বিদেশী প্রতিষ্ঠান শেভরণের নিরাপত্তা কর্মি হিসাবে দায়িত্ব পালন করে গেছেন বছরের পর বছর। এক সময় তারা আবিষ্কার করেন, শেভরণ কর্তৃপক্ষ তাদের একেক সময় একেকটা বেসরকারি সিকিউরিটি কোম্পানির কর্মচারি হিসাবে গণ্য করে। ঘন্টা হিসাবে নাম মাত্র পারিশ্রমিকে অন্যান্য সুযোগ সুবিধাহীন অবস্থায় যাচ্ছিল তাদের দিন রাত। এক সময় তারা শ্রম আদালতে মামলা ঠুকে দিলে মানবাধিকারের ধ্বজাধারী শেভরণ কর্তৃপক্ষের মুখোশ খুলে যায়। চরম অমানবিক হয়ে উঠেন তারা। একের পর এক চাকুরীচ্যুত করতে থাকেন মামলাকারী নিরাপত্তা কর্মিদের মধ্যে নেতৃস্থানীয়দের। পর পর ৪ ধাপে মোট ২১ জন নিরাপত্তা কর্মিকে চাকুরীচ্যুত করে তারা রাস্তায় বসিয়ে দিয়েছেন। অসহায় এই মানুষগুলো পরিবার পরিজন নিয়ে এখন চোখে অন্ধকার দেখছেন। খেয়ে না খেয়ে তাদের দিন যাচ্ছে চরম অনিশ্চয়তায়। শুধু তাই নয়, শেভরণ কর্তৃপক্ষ এখন মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি ও মানসিক নির্যাতন শুরু করেছেন বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
শেভরণ বাংলাদেশ সিলেটের চাকুরীচ্যুত নিরাপত্তা কর্মিরা বুধবার দুপুরে সিলেট জেলা প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলণে এসব অভিযোগ করেন। সংবাদ সম্মেলনে চাকুরীচ্যুতদের পক্ষে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সিকিউরিটি ইন্সপেক্টর মো. জুবের আহমদ।
তিনি বলেন, তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন কোম্পানিগুলোতে স্থানীয়দের চাকুরী দেয়ার দাবী জোরালো হলে ১৯৯৬ সাল থেকে মৌখীকভাবে তৎকালীন অক্সিডেন্টাল নিরাপত্তা কর্মি হিসাবে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের লোকজনকে চাকুরী দিতে শুরু করে। পরে ইউনিকল, ও শেভরণ আসার পরও এই ধারা অব্যাহত রাখে। এক সময় আমরাও আবিস্কার করি আমরা শেভরণের নয়, বিভিন্ন সিকিউরিটি কোম্পানির অধিনে কাজ করছি। প্রথমে আহমদ এন্ড কোম্পানি এরপর আইএসএসএল, জি ফোরস গ্রুপ (গ্রুপ-ফোর কোম্পনি), ‘সিকিউরেক্স’ এবং সর্বশেষ ‘সেন্ট্রি’ সিকিউরিটি সার্ভিসেস লিমিটেডের কর্মি হিসাবে আমাদের ভাগ্য বদল হতে থাকে। অথচ ৬ মাস কাজ করার পর শেভরণের স্থায়ী কর্মি হিসাবে নিয়োগ দেওয়ার বিধান রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে একসময় প্রায় ২৩৫ জন নিরাপত্তা কর্মির মধ্যে চরম হতাশা নেমে আসে। শেভরণের নিয়মিত কর্মি হিসাবে আমাদের তালিকাভূক্তির জন্য আমরা বার বার ধর্ণা দিয়ে ব্যর্থ হয়ে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন কর্মসূচি শুরু করি। এসব কর্মসূচির অংশ হিসাবে ২০১৬ সালের ১৮ ডিসেম্বর লাক্ষাতুড়ায় শেভরণের মূল ফটকের সামনে ১১ দফা দাবি আদায়ের জন্য শান্তিপূর্ন মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করি। আমাদের ১১ দফা দাবিগুলো হচ্ছে (১) ৫% হারে বকেয়া বাৎসরিক মুনাফা আদায় (২) চাকুরী স্থায়ীকরণ (৩) প্রতি বছর বাৎসরিক বেতন বৃদ্ধিকরণ (৪) শ্রমিক কল্যাণ তহবিল সংযুক্তকরণ (০৫) জ্বালানী খনিজ ক্ষেত্রে নিরাপত্তা-কর্মচারীদের ঝুঁকি ভাতা সংযুক্তিকরণ (৬) নিরাপত্তা-কর্মচারীদের বাসস্থান ও যাতায়াত ভাতা সংযুক্তকরণ (৭) স্থায়ী ও অস্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বৈষম্য নীতি দূরীকরণ (৮) অনাদায়ী ছুটি নগদায়ন (৯) সপ্তাহিক ছুটি ২দিন ধার্য্যকরণ (১০) প্রত্যেক নিরাপত্তা-কর্মচারীদের বীমায় সংযুক্তিকরণ ও (১১) বেতন বৈষম্য দূরীকরণ।
তিনি বলেন, মানববন্ধন শেষে ‘সেন্ট্রি’র প্রজেক্ট ম্যানেজার মেজর অব. কামরুজ্জামান নিরাপত্তা কর্মিদের জানান, শেভরণ এসব দাবি দাওয়া মানবেনা। তিনি মামলাদায়েরের পরামর্শ দেন এবং মামলা পরিচালনার খরচ প্রদানেরও আশ্বাস দেন। পরে ২০১৭ সালের ২ ফেব্রুয়ারি সিলেটের জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটি স্মারকলিপিও প্রদান করি। স্মারকলিপির কপি শেভরণ বাংলাদেশের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছেও পাঠানো হয়। কিন্তু এ ব্যাপারে তারা কোন উদ্যোগ গ্রহন না করায় ২৭ ফেব্রুয়ারি ১ম শ্রম আদালতে একটি মামলাদায়ের করি। মামলাটি ১৭ এপ্রিল মেইন্টেনেবল নয় বলে বিচারক খারিজ করে দিলে ঐ বছরের ২২ মে লেবার অ্যাপিলেইট ট্রাইব্যুনালে ২২১ জন বাদী হয়ে মামলাটি পূনরায় পুটআপ করি। আদালত মামলাটি গ্রহন করে সেদিনই শুনানি শেষে মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত, ২২১ জনের কাউকে বদলি বা চাকুরিচ্যুত করা যাবেনা, এমন কি কোম্পানিও কারও কাছে বিক্রী বা হস্তান্তর করা যাবেনা মর্মে নির্দেশনা জারি করেন (স্ট্যাটাসকো)। শেভরণ হাইকোর্টে যায়। তাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে ঐ বছরের ৭ জুলাই হাইকোর্ট আদেশটি স্থগিত করে দেন। পরে আবার আমাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে ঐ বছরের ১২ অক্টোবর স্থগিতাদেশটি প্রত্যাহার করে নেন। কিন্তু নভেম্বরের ২৮ তারিখ আবার স্থগিতাদেশ ৬ মাসের জন্য পুনর্বহালের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। এরপরই আমাদের উপর নেমে আসে কোম্পানির ছাটাইয়ের খড়গ।
শেভরণ বাংলাদশের বর্তমান সিকিউরিটি ডাইরেক্টর মেজর (অব.) হাসনাইন চৌধুরী, ফিল্ড সিকিউরিটি ম্যানেজার রাজিউল হাসান, মো. আলী ইউসুফ, মমিনুল হকসহ অন্যান্য ফিল্ড সিকিউরিটি ম্যানেজারের প্ররোচনায় দফায় দফায় চরম নিষ্ঠুরভাবে বিনা নোটিশে হঠাৎ করে চাকুরিচ্যুত করছেন। মামলাদায়েরকারীদের মধ্যে নেতৃস্থানীয়দের বাছাই করে ৪ দফায় মোট ২১ জন নিরাপত্তা কর্মিকে ছাটাই করে একেবারে রাস্তায় বসিয়ে দিয়েছেন। সুন্দর স্বচ্ছল জীবনের আশায় নিজেদের মূল্যবান ১৮/২০ বছর এই কোম্পানিতে নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করেছি। শেভরণ প্রথমেই নিরাপত্তা নিশ্চিতের কথা বললেও মাঠ পর্যায়ে তাদের এ সংক্রান্ত উদ্যোগ নেই বললেই চলে। নিরাপত্তা কর্মিদের যেসব কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের জন্য পাঠানো হয় সেসব জায়গায় বিশুদ্ধ পানি স্যানিটেশন ব্যবস্থা নেই। বছরের পর বছর এমন কঠিন অবস্থায় থেকেও আমরা আমাদের দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করেছি বা করছি। এখন নিজেদের সমস্যা সমাধান ও ন্যায্য দাবি আদায় করতে গিয়ে আজ আমরা কর্তৃপক্ষের কোপানলে পড়ে সর্বস্ব হারিয়ে পথে বসে গেছি। আমাদের সামনে কেবলই অন্ধকার। আমরা আজ মানবেতর জীবন-যাপন করছি। কর্মজীবনের ১২ থেকে ২০/২২ বছর হারিয়ে এখন আমরা দিশাহারা। এই বয়সে অন্য কোথাও চাকুরী পাওয়াও আমাদের জন্য হীমালয় সমান কঠিন। শুধু চাকুরীচ্যুতিই নয়, শেভরণ কর্তৃপক্ষ এখন আমাদের মিথ্যা অভিযোগে মামলা দিয়ে হয়রানি করতে শুরু করেছে। গত ৪ মে তারা সিলেটের বিমানবন্দর থানায় চাকুরীচ্যুত সিকিউরিটি ইন্সপেক্টর মো. জুবের আহমদের নামে ভাংচুরের মিথ্যা অভিযোগে একটি মামলাদায়ের করে (নং ৬৪, ৪/৫/১৮)। এতে আমরা মানসিকভাবে যেমন নির্যাতিত হচ্ছি, আর্থিক ও সামজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। শেভরণ মুখে মানবাধিকারের কথা বললেও আমাদের ব্যাপারে তারা চরমভাবে মানবাধিকার লংঘন করছে। তারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ পেট্রোবাংলা ও শেভরণ বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশের সর্বস্তরের জনগনের প্রতি সুন্দরভাবে বাঁচতে সহযোগিতার আহ্বান জানিয়ে আন্দোলনের কারণে যাদের চাকুরিচ্যুত করা হয়েছে তাদের পুনর্বহাল, ১১ দফা দাবি বাস্তবায়ন এবং আদালতে মামলাটি চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত যেনো আর কোন নিরাপত্তা কর্মিকে চাকুরিচ্যুত করা না হয়, সরকার, প্রশাসন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষসহ সচেতন দেশবাসীর কাছে আকুল আবেদন জানান।
সংবাদ সম্মেলণে চাকুরীচ্যুত নিরাপত্তা কর্মিদের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন সিকিউরিটি অ্যাসাইনমেন্ট অফিসার মামুন আহমেদ খান, বুধচন্দ্র শর্মা, মো. জীবন উদ্দিন, মো. সুমন মিয়া, আব্দুল করিম, আজিজুর রহমান (সেবুল), মো. মালিক মিয়া, জমসেদ আলী ও আব্দুস সালাম।